অসময়ের অল্প কৃষ্ণচূড়া
...আগামী পৃথিবী কান পেতে তুমি শুনো…
খোলা আকাশ। মহাশূন্যে দিগন্ত মিশেছে যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে রঞ্জন। মাঠের উপর। একা। একেবারেই একা।
কখনো সোনালী ধানের বুকে, সদ্য মাটিতে পরা শিশিরের মাঝেও কখনোবা। এভাবেই তো সে থাকতো দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে ঐ পৃথিবীর ছাদের নিচে। অনাদরে মাটিতে পড়ে থেকেও কৃষ্ণচূড়া যেভাবে আগুন ছড়ায়, নিষ্পাপ শ্বাস দেয় ঠিক সেভাবেই তো রঞ্জন নতুন আগুন বিলিয়ে দেবে বলে বন্ধুতা করেছিলো আকাশের সাথে। কখন যেন মঞ্চ হয়ে আকাশ নীল রঙে রঞ্জন কে চুবিয়ে দিতো তার টের তো পায়নি। তবে টের পেতো নীলের আভা, মঞ্চের মৌতাত, হৃদয়ের ঘ্রাণ, আর কাব্যময়তায় ঘেরা শব্দের গানেদের। ফিরে ফিরে আসে সেই গানের মায়া। এ গানেরা মায়াময়। কালোয় ঘেরা প্রাণের মঞ্চে হাত পা বুক পেট মাথা তলিয়ে যেতে চায়। কখনো বা বাচ্চা হরিণের মতো সুখছন্দে পা মেলাতে চায় সৃষ্টির আনন্দে। অভিনেতার রক্তের গুহায় চরিত্রকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চায় রঞ্জন...
তাল তাল রক্ত মাংস কেমন করে জীবন পাবে খুঁজে চলে রঞ্জন তার মঞ্চের জীবনে।
খুঁজে বেড়ায়...একদিন… দুদিন...বছরের পর বছর। পাগলের মতো অস্থির সে। মাটির গভীর নিচে যে সুরঙ্গপথ চলে গেছে আকাশের দেওয়ালে,ঠিক সেখানে দাঁড়িয়ে অভিনয় করে রঞ্জনের চরিত্ররা। মঞ্চের নতুন ভাষা রঞ্জনের মুখে ধরা দেয় সংলাপ হয়ে...
সুরে গেয়ে ওঠে রঞ্জনের সংলাপেরা....
" আমি যদি আর নাই আসি হেথা ফিরে..."
এখন মঞ্চের আপ সেন্টারে রঞ্জন....তার সামনে পৃথিবী। মাঝে রক্তেভেজাআয়না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রঞ্জন... আর এক পিঠে পৃথিবী। আপ লেফটে এক মোহময় আলো এসেছে আজ। সেও কথা বলে, তবে সংলাপ নয়। শুধুই শব্দের ছায়াবাজি। পৃথিবী সংলাপ বলে চলে।
রঞ্জন আজ স্থবির.... এলোমেলো...আনমোনা...মাটিতে পড়ে থাকা অল্প কিছু কৃষ্ণচূড়া যেন। কেউ কুড়িয়ে না নিলে হয়তো মাড়িয়ে দেবে তাকে কেউ। এদিকে মোহময় ছায়াবাজ আলো দখল নেয় ডাউন সেন্টারের। স্থবির রঞ্জন একটু কি নড়ে ওঠে? চোখের পাতা কি খুলছে রঞ্জনের? পা কি পরের পা ফেলার জন্য করছে ছটফট? ডাউন লেফট তো ফাঁকা। ওখানে যাবে কি রঞ্জন?
এগিয়ে আসছে পৃথিবী ডাউন লেফটের দিকে... একপা একপা করে। সাথে করে রক্তেভেজাআয়না।
এখন রক্তে বিষ।
এ পান্ডুলিপির চরিত্র চারটি
রঞ্জন...পৃথিবী...ছায়াবাজ আলো...আর রক্তেভেজাআয়না...
পান্ডুলিপি আশ্রয় পায় থিয়েটারে...মঞ্চে
পৃথিবী: আমি তো কান পেতেই আছি। শুনতে চাই
রঞ্জন: শুনতে চাইলেও তো তুমি শুনতে পাওনা। বধির এক বৃদ্ধ তুমি। তোমার কান শুনতে পায়না কিচ্ছু।
পৃথিবী: এই বৃদ্ধের বুক চিরে দেখো পেঁজা তুলোর মতো কেমন গরল ধারন করে স্থবির ব্যাঙের মতো আমার রুপ, আমার সাজ পোষাক।
ছায়াবাজ আলো: তুমি একটা মিথ্যুক পৃথিবী।তোমার মুখ, চোখ, নাক, কান, আর মুখের অভিব্যক্তি সব সাজানো। সব। আমায় দেখো। আমায়। আমার এই ছটা তোমার মুখে পড়েছে। দেখো রঞ্জন দেখো। এই যে তোমার পৃথিবী। যার মুখে আজ কেমন প্রতারকের বলিরেখা। বলিরেখারা কেমন করে অসহায়
চাহনিতে চিৎকার করে বলতে চাইছে..." মুখোশে ঢাকা তোমার মুখ... তোমার মুখাবয়ব। তুমি ভিতু,কাপুরুষ, তুমি নপুংসক। তোমার কোন দাম নেই। নেই কোন মর্যাদা... তুমি অসহায় এক প্রাণী। কারোকে আশ্রয় দেবার ক্ষমতা তোমার নেই.... তুমি একটা অপদার্থ... অপদার্থ তুমি পৃথিবী.... অপদার্থ..."
রঞ্জন: আহ। তোমার এই আস্ফালন যন্ত্রণা দিচ্ছে আমায় ছায়াবাজ আলো। তোমার ঐ তীব্র সাদা আলো পুড়িয়ে দিচ্ছে আমার শরীর। আমার চোখের পাতা পুড়ে যাচ্ছে....থামাও তোমার এই আস্ফালন। থামাও।
রক্তেভেজাআয়না: তোমরা সবাই দাঁড়াও একবার আমার সামনে। দেখো একবার নিজেদের মুখ,হাত,পা...কাচের পর্দা ভেদ করে অভিনয় করো একবার তোমাদের প্রাণের মঞ্চে... একবার করো। একবার...
একি! তোমরা সবাই সরে সরে যাচ্ছো কেন? কেমন যেন নিরাপত্তার অভাবে ভুগছো তোমরা? রঞ্জন,তুমি তো পৌষ আনবে আমি জানি। তুমিও সরে সরে যাচ্ছো? এতো নিরাপত্তাহীনতার ভয় তোমারও?
রঞ্জন: চুপ করো তুমি। চুপ করো
রক্তেভেজাআয়না: আজ আমার শরীর ভিজে যাচ্ছে রক্তে। পূর্ণিমার রুপোর চাদরে ঢাকা আলো কেমন লাল হয়ে গেছে দেখতে পাচ্ছোনা তোমরা? আজ তোমাদের মঞ্চ গেছে রক্তে ডুবে। ঐ তো অভিনেতাদের শরীর ভুবে গিয়ে হাতগুলো কেমন চিৎকার করে বলছে...
" নিরাপত্তাই যদি সব হতো তবে মাতৃগর্ভের প্রবল নিরাপত্তা ছেড়ে এই ধুলোর পৃথিবীতে কেন আসতাম? কেন?"
রঞ্জন: আহ! পাগল হয়ে যাবো আমি পাগল হয়ে যাবো। আমার শিরা বেয়ে মাথার মধ্যে প্রবেশ করছে তোমার ঐ অমঘ শব্দেরা।সরে যাও ছায়াবাজ আলো, রক্তে ভেজা আয়নার সামনে দাঁড়াতে চাইনা আমি.... আমার হাত ধরো পৃথিবী। সরিয়ে দাও এই বিষ। খুলে দাও মঞ্চের গরাদ। আমি ছুটতে চাই সেই
মহাশূণ্যে যেখানে মিশেছে দিগন্ত... মাঠের ওপর দাও খোলা আকাশ মঞ্চের নীল রঙ লেগেছে যার ছাদে। সোনালী ধানের বুকে মুক্তোর দানার শিশির দাও। অসময়ের অল্প কৃষ্ণচূড়া হয়ে পড়ে থাকবো মাটিতে...ঠিক কুড়িয়ে নেবে কেউ।
দুরের মাঠে পৌষ আসবে বিশু পাগলার গান হয়ে
" তবু আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে..."



অসাধারণ
উত্তরমুছুন