গদা হারির পড়া
বেলা পরে এসেছে, সন্ধে নামলো বলে..দ্রুত পা চালিয়ে না গেলে আর উপায় নাই! ছোড়দি ওকে, বার বার বলেছে বেলা থাকতেই যেন অমরেশ পৌঁছে যায়; ‘পাথারের মাঠ’-এর এই রাস্তা সন্ধের পর মোটেও নিরাপদ নয়, চুরি, ডাকাতি এমনকি খুনও নাকি হয় এখানে। কোথায় আর পৌঁছান গেল বেলা থাকতে! মা তো আসার সময় নারকেল নে, বিলেতি আমরা গুলো নিতে ভুলিস না এসব করে দেরি করলো,১১ টার ট্রেন তো পাওয়া গেলনা, তার ওপর ১ টার ট্রেন এতো লেট, ধাত্রীগ্রাম পৌঁছাতেই নিলো প্রায় 3 ঘন্টা। বেহুলা থেকে এত দেরি হওয়ার কথা নয়, লুপ লাইনে কি না কি কাজ হচ্ছে, থেমে থেমে এলো ট্রেন; আর তেমনি ভীড়। অমরেশের এই কারণেই এ লাইন এর ট্রেন একেবারে পছন্দ নয়। যখন নান্দাই এ নামলো, তখন বেলা প্রায় সাড়ে চারটে।ওখান থেকে নেমে রিক্সা করে আসতে হলো প্রায় মিনিট 15 তারপর এই মাঠের রাস্তা। বিশাল যে হাঁটতে হবে তা না, সব মিলিয়ে হয়তো কিমি দেড়েক! অমরেশের ওটুকু হাঁটা বলতে গেলে, গায়ে ঘাম আনার জন্যও অনেক কম, কিন্তু ওই যে মাঠটার নাম পাথারের মাঠ আর ভয় এর কারণ ছোড়দির ওই সাবধান বাণী।
এই সেপ্টেম্বর এর শেষ দিকে সন্ধে নামে ঝুপ করে, যেন মনে হয় কোন আদিম নরখাদক দানবের ভয়ে প্রকৃতি তার প্রিয় মানুষ দের লুকিয়ে নিতে চায় আঁধারের আড়ালে ; একটা নিকষ কালো চাদর মুড়িয়ে সব কিছুই যেন গা ঢাকা দেয়। পাড়া গাঁয়ের ব্যাপার, আলো বলে কিছু থাকে না রাস্তায় বরং অন্ধকার বেয়াড়া দস্যি ছেলের মতো দাপিয়ে বেড়ায়। ওর ছোড়দি, টুম্পার যে গ্রাম এ বিয়ে হয়েছে তার নাম ভগবতী তলা। একদমই অজ জায়গা, তাঁত এর কাজই এখানে প্রায় সবার রুজি রুটির একমাত্র রাস্তা। অমরেশের জামাই বাবুর নাম রাজকুমার মালিক, সেও তাঁতের কাজই করে। ভালো হাতের কাজ এর জন্য জামাই দার বাজারে বেশ নাম ডাক আছে। একবার গ্রামের কাওকে পেলেই যদি অমরেশ নাম টা বলে দেয় তো ওকে নিশ্চয় পৌঁছে দেবে। এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই সে হাঁটা লাগালো পাথারের মাঠ এর বুক চেরা রাস্তা ধরে।প্রধানমন্ত্রী গ্রামীন সড়ক যোজনায় রাস্তা একটা হয়েছিল সেটা বোঝা যায়, ব্যাস এটুকুই। খানা খন্দ খাল ডোবায় ভর্তি এই রাস্তা খুব বিপজ্জনক! অমরেশ এর মত একজন আনকোরা লোকের কাছে তো আর কথায় নেই। তার ওপর আবার রাস্তার দুই ধারের বড় বড় শিশু, সোনাঝুড়ি গাছের জন্য অন্ধকার যেন একটু বেশিই গাঢ় আর বিকট । অমরেশ নেহাত ভূতে ভয় পায়না, নাহলে আজকের দিনে এই রাস্তায় কেও নামতে সাহস করতো না পাছে শিশু গাছ গুলো ভৌতিক জাদুতে জেগে উঠে ঝাঁপিয়ে পরে! অমরেশের ও যে গা- ছম ছম করেনি তা নয়, বেশ কয়েকবার মনে হয়েছে, কারা যেন হাঁটছে ওর পিছু পিছু । নিঃ শব্দ সেই চলন, অঙ্গী ভঙ্গি করে হাসছেও তারা, ও কে বিদ্রুপ করে। তাতে অবশ্য কিছু আসে যায়না, ভয় ওর নেয়।
“কতদূর এলাম কে জানে! এখন কটা বাজবে ?”
ঘড়িতে কিচ্ছু দেখা যায় না এই অন্ধকারে, মোবাইল ফোন তো একটাই ওটা বাড়িতে আছে । এরকম অন্ধকার যে হবে, সেটা তো আর আশা করে বেরোয়নি বাড়ি থেকে, তাই সাথে টর্চ ও নেয়। বাধ্য হয়েই নিজের চোখ আর গ্রামীন মানুষের যাকে বলে ধাত সয়ে যাওয়া, সেই সম্বল করেই যেতে হবে বাকি যেটুকু রাস্তা।
"দিদি একটা তেমাথার কথা বলেছিল না?"-একবার দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলো।
"সেটা এখনো এলোনা কেন?"
যতক্ষন ধরে ও হাঁটছে, তেমাথা তো এসে যাওয়ার কথা! সেখান থেকে ডান দিকে বেঁকে যেতে হবে, তারপর কিছু দূর হেঁটে গেলেই গ্রামের মুখে একটা মনসা তলা, তার তিন চারটে বাড়ি পরেই ছোটদির বাড়ি। এত ক্ষণ হেঁটেও অমরেশের চোখে না পরছে কোনো জন মানুষের নিশানা না আলোর একটা বিন্দু ।
'এলাকায় কারেন্ট নেয় নাকি?'
একে অচেনা জায়গা, তারওপর এরকম কালো অন্ধকার রাত, ওর মতো সাহসী ছেলের বুকের ভেতর টাও কেমন ভারী ভারী হয়ে যাচ্ছে। ভালো লাগছেনা , বাড়িতে মা এর বোধহয় এতক্ষনে সন্ধে দেয়া হয়ে গেছে, মানিক, বকুল ওরাও বোধহয় খেলার মাঠে আড্ডা জমিয়ে বসে গেছে! অন্ধকার চোখের মনিতে আলোয় ভরা পাড়া ভেসে উঠলো।ইংরাজিতে একে বলে ‘ফ্ল্যাশ মেমোরি’ অনাকাঙ্ক্ষিত সময়ে এই ফ্ল্যাশ মেমোরি ধাঁধা সৃষ্টি করে। অমরেশেরও হল তাই, মুহূর্তের মধ্যে সামনের অন্ধকার আরো ভয়ঙ্কর রকমের কালো লাগছে ..'আজ অমাবস্যা নাকি?’
অন্ধকারেই পা চালিয়ে হাঁটছে সে..হাত পাঁচেক এগিয়েছে এমন সময়.. ‘ঘ্যাক’ শব্দ করে কি যেন লাফিয়ে উঠলো পায়ের তলায় ! হতচকিত হয়ে অমরেশ এর শরীর কাঠ হয়ে গেল মুহূর্তে; শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল পায়ের নিচ পর্যন্ত। কি যেন একটা ছায়া সামনে নড়াচড়া করছে..দুপেও না চার, কিচ্ছু বোঝা যায় না; চোখ দুটো কুঞ্চিত করেও ঠাওর হয়না কিছুই।
আচমকা এই ঘটনায় ওর পা যেন মাটিতে আটকে গেছে, অনেক ক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে ..সাপ নাকি? ব্যাঙ ও হতে পারে। কুকুর বা শেয়াল হলে চিৎকার করতো এতক্ষনে নিশ্চয়। কপালের পাশ দিয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে শিরশির করে। চোখ বিস্ফারিত করেও কিচ্ছু দেখা যায়না। অমরেশ বেশ বুঝতে পারছে ওর শরীরে ভয় ভারী হয়ে চেপে বসেছে ধিরে ধিরে। মুখ তুলে সামনের দিকে তাকিয়ে মনে হল, এই নিকষ কালো অন্ধকার যেন বিভৎস্য চেহারার কোনো দৈত্যের মত নিঃশব্দে মুচকি হাসছে; এক পা বাড়ালেই ওকে খেয়ে ফেলবে ।
যেন মানুষ বর্জিত কোন প্রেতপুরীর সিংহ দ্বারে দাঁড়িয়ে আছে ও একা। আর এক পা বাড়ালেই ঢুকে পরবে ভিতরে।
শরীরের সব সাহস দিয়ে নিজেকে আস্বস্ত করে আরেক পা ফেললো অমরেশ।
ও মা গো! কি এটা…… উফ!!!
কিছু নরম মাংসল যেন পা দিয়ে দলিয়ে ফেলেছে..টাল খেয়ে মাটিতে পরেই যেতো, কোন রকমে নিজেকে সামলে কয়েক পা পিছিয়ে গেল।
একবার ভাবলো হাতরে দেখবে অন্ধকারে? যদি বড় সাপ হয়? না না সে বোকামি করা যাবে না। শন শন শব্দ করে হঠাৎ হওয়া বয়ে যাচ্ছে ওকে ছুয়ে দিয়ে, ঠিক ঝড়ের আগের ঝোড়ো বাতাসের মতো গুমোট ধরা হওয়া। অমরেশ আকাশের দিকে দেখল, একটাও তারা চোখে পড়ছে না। আকাশ নিঃশব্দে ওর জন্য সহানুভূতি ব্যক্ত করেছে না সেও কোনো অজানা জন্মান্তরের প্রতিশোধ নিচ্ছে কে জানে!
একটু পাশ কাটিয়ে রাস্তার অন্য পাশে গিয়ে আবার এক মুহূর্ত দাঁড়ালো । আগে যাবে? নাকি আবার স্টেশন এ ফিরে যাওয়া টা ভালো হবে? ‘এ যা আবহাওয়া যদি ঝড় টর হয়?’
ফিরে গিয়ে লাভ নেই, যা হয় হবে আগে যাওয়াই ভালো ভেবে হাত দশেক সবে এগিয়েছে, এমন সময় ‘করাম’ শব্দে আকাশ ফাটিয়ে বাজ পড়লো কাছে পিঠে কোথাও, সাথে সাথে চোখ ঝলসে ওঠা আলোয় এক মুহূর্তের জন্য প্রকৃতিকে দেখতে পাওয়া গেলো।
‘উফফ এটাই তো বাকি ছিল!’
কি করবে অমরেশ এবার ? ছুটে পালিয়ে যাবে কি ? মনের মধ্যে এসব নানা চিন্তা চলছে, ঠিক তখনই পিছন থেকে কে যেন ওর কাঁধে হাত রাখল। একটা ঠাণ্ডা, স্যাঁতস্যাঁতে হাত ।
‘কুতায় যাও বাবা, হি হি হি ?’ কেও হাসছে ওর ঠিক পিছনে !
আমাদের শরীরে ভয় প্রথমে একটা বিন্দুতে জমা হয়, ব্ল্যাক-হোল এর মতো। সেই ছোট্ট ব্ল্যাক-হোল আস্তে আস্তে বারে, এক সময় মানুষের সব চিন্তা আর চেতনা খেয়ে ফেলে, মানুষ দিশেহারা হয়ে যায়। আচমকা ঠাণ্ডা হাতের ছোঁওয়ায় অমরেশের বুকটা ধরাস করে উঠতেই ওর ভয়ের ব্ল্যাক-হোল কার্যত ফেটে গেলো বাজির মতো, এতক্ষন ধরে জমাট বেঁধে থাকা সব ভয় গলে গিয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে গেল নিমেশে। আর তখনই আবার আকাশ ছিন্ন ভিন্ন করে বাজ পড়লো বিকট আওয়াজ করে। অমরেশ ভীষণ ভাবে তার বেঁচে থাকা অনুভব করছে, বুকের আওয়াজ শরীরের সপব শিরা উপশিরা গুলকে যেন কাঁপিয়ে দিয়ে বাজছে। পেটের ভেতর কোথাও মোচড় দিচ্ছে।
‘কুতায় যাও বাবা?’ আবার সেই গলার আওয়াজ, সেই হি হি শব্দের হাসি! একটা দৈত্যাকার হাতের নখ অমরেশের কাঁধে গভীর ভাবে যেন বসে যাচ্ছে।
‘কি হল বলো? ভয় পাচ্ছ নাকি?’
প্রশ্ন গুল যেন পিছন থেকে নয় কোন আদিম কুয়ো থেকে উঠে আসছে, পাতালের তলা থেকে কেও ফিস ফিস করে বলছে! অমরেশের উত্তর দেয়ার, পিছনে তাকিয়ে দেখার ক্ষমতা উবে গেছে। গাছের মতো স্থির হয়ে ও যেন হাওয়াতে ভাসছে ।
'কে হে তুমি ছোকরা?, দশ মিনিট ধরে দেকচি, এখানেই দায়রে আচো.. না এগুচ্চ না পেচুচ্ছ। কি ব্যাপার কি তুমার? আমি তকন থেকে দেকচি, আঁধারে ঠিক ঠাওরাতে পারচিনা, তুমার জন্যে আমিও এগুতে পারচিনা। বলো তো কি হয়েচে?'
এতগুলো প্রশ্ন শুনে অমরেশ বুঝল 'উফফ একজন মানুষ!!!!'
অমরেশ একটু ধাতস্থ হয়ে পিছন ঘুরে দাঁড়াল, বিদ্যুতের ঝিলিকে চোখে পরলো শুকনো, তুবড়ে যাওয়া অপুষ্ট, পাংশুটে এক খানি মুখ, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, উষ্কখুষ্ক অবিন্যস্ত চুল। বিদ্যুতের ছটা যেন বুড়ো লোকটার চোটে যাওয়া বাদামি চোখ জুড়েও ঝিলিক মেরে উঠলো।
‘বুকে কি ব্যাতা করছে গো..উফ, কি যে হলো কে জানে' -নিজের খেয়ালই বলে চলেছে লোকটা আর সাথে সাথে মদের গন্ধে ভরে যাচ্ছে নাকের কাছের বাতাস । কিছুক্ষন সব চুপ, অমরেশ ঘটনার আবেশের মধ্যে এখন আটকে ওর কথা বলার ক্ষমতা যেন ফিরতেই চাইছে না।
'হ্যাঁ বাপ মদ আমি একটু আধটু খাই ‘ নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে বুড়োটা বললো, ‘নাহলে যে রাত জগতে পারবোনা, ওই সামনে একটা আম বাগান আছে, ওই খেনেই থাকি বুঝলে, রবি চাষ লেগেছে গিরামে, আমি রাতে মাঠে জল চালাই, সারা রাত জেগে পাহারা দিতে হয়।'
অমরেশ লোকটির আঙ্গুল নির্দেশ বরাবর সামনে তাকালো বটে তবে জমাট বাঁধা অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখা গেল না।
অমরেশ কোনো কথা বলছেনা দেখে, বুড় জিজ্ঞেস করলো,
'কোই বললে না তো, কুতাই যাচ্চ? একখুনি তো ঝড় উটবে, কাদের বাড়ি যাবে?কুন গাঁয়ে? উফফ বাবা বুকের ব্যাতাটা আজ আর যাবে না।'
একটু একটু করে এতক্ষনে সহজ হয়েছে অমরেশ-' আসলে, আমি যাচ্ছিলাম ভগবতী তলা, অন্ধকারে বুঝতেই পারছিনা কতদূর যে এলাম!'
লোকটি তার মুখের কথা ছিনিয়ে নিয়ে বললে, ভগবতী তলা? এই দেখ কার বাড়ি গো? কে হয় তারা তুমার?'
'রাজকুমার মালিকের বাড়ি, আমার জামাই দা।'
'ওহো হ..পানু মালিকের ছেলের বাড়ি? আরে আমি তো ওদের সবাইকে চিনি, আমার মেয়ে ছবির তো ওই গিরামেই বাড়ি গো।' বলেই আগের মতোই 'হি হি' করে হাসতে লাগলো।
বুড়োটা একমুহূর্ত দম নিয়ে বললো,'তুমার জামাই দা কে আমার নাম করে বলো, বলো যে গদাধর দলুই এর সাতে দেকা হয়েছিল..আমাকে খুব চেনে।'
জামাই দাকে চেনে শুনে অমরেশ এবার নিশ্চিন্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো, 'আর কতক্ষন যেতে হবে?'
অন্ধকারে দেখা গেল না যদিও তবে গলার আওয়াজ শুনেই অমরেশ বুঝলো, বুড়ো ভুরু কুঁচকে বললো…
'সে এদিকে কুতাই, সে তো অনেক পেচনে, তুমি এদিকে কুতাই যাচ্ছ?'
অমরেশ বুঝলো অন্ধকারে নিশ্চয় তেমাথা পেরিয়ে গেছে ।
'আমার টর্চ টা বাপু আমার আটচালায় রাকা আছে, ওই যে আমার বাগান, সামনেই গো, আমার সাতে তবে চলো, সুকুল একাই বসে আচে বাগানে, ওকে একবার দেকা দিয়ে আসি আর টর্চ টাও নিয়ে আসি, সুকুল বিরাট ছেলে একাই থাকতে পারবে, তবে ঝড় আসচে তো আমি না ফিরলে ভয় পেতেও পারে, সেই সন্ধেয় ওকে বসিয়ে একটু খেতে গেসলুম, একটু বলে আসবো আর টর্চ টা নিয়ে আসবো, তুমাই এগিয়ে দিয়ে আবার তখন যাবো ওর কাছে। চলে চলো..'
অমরেশে এই দুর্বিপাকের রাতে বুড়োর কথা শোনা ছাড়া কোন উপায় খুজে পেলো না, অগত্যা …
গদা আগে আগে হাঁটছে বেশ সচ্ছল গতিতেই, পিছু পিছু খানা খন্দে টলমল করে চলেছে অমরেশ ।মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর, একটা মোটা আল পথে নামলো তারা দুজনে, এটা ওটা সেটা নানান কথা বলতে বলতে অমরেশ এখন একদমই চনমনে । ক্রমাগত বিদ্যুতের ঝলকে ওর বরং সুবিধাই হচ্ছে চলতে। আল পথের শেষে অদূরেই অমরেশের চোখে পড়লো একটা বিরাট বড় দীঘি আর তার পাশেই আম বাগান; দিঘীর ঠিক গায়ে একটা আটচালা মতো ঘর, অবশ্য পাকা ছাদের।
টিপ টিপ শব্দে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে…
গদা সমানে পা চালিয়ে যাচ্ছে আগের মতো, অমরেশও ।
'এই তো পৌচে গেচি, ভালোই হলো বুঝলে, যদি বিষ্টি হয়, থাইলে খানিক রয়ে বসে যেতে পারবে, মাঠের এই খানে তো আর মাতা গুজার ঠাঁই পাওয়া যাবেনা।'
মনে মনে অনেক খানি কৃতজ্ঞতা বোধ করলো অমরেশ, যা বিপদে ও পড়েছিল!
আটচালার, পর্দা দিয়ে ঘেরা একটা অংশ রয়েছে, বোধহয় সেখানেই রাতে ঘুমায় দুজনে; গদা গলা উঁচিয়ে চিৎকার করে ডাকলো-'সুকুল, কই রে! ঘুমোচ্ছিস নাকি বাপ? আমি চলে এলুম, সাতে দেখ এই ভাই টারে এনিচি, কই রে?’ - বলে সেই আগের মতো হি হি করে হাসল ।
পর্দা ঠিক নয়, কাছে গিয়ে অমরেশ বুঝলো, বেশ কয়েকটা চিকের বস্তা দিয়ে ঘেরা রয়েছে চালার একটা কোন, বোধহয় হাওয়া আটকানোর জন্য, বা মশাও হতে পারে। বস্তার এক পাশটা টেনে সরিয়েও ভিতরে দেখা মিলল না সুকুলের।
বুড়ো বললো, 'বড় দস্যি ছেলে, রাতেও ভয় ডর করেনা একফোঁটা! আচে কুতাও আসে পাশেই, 'এহ এহ'।
আচমকা আটচালার অন্য পাশে একটা বসবার মতো জায়গায় চোখ পড়তেই চমকে গেল অমরেশ, একটা দশ বারো বছরের ছেলে নিষ্পলক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে আকাশের দিকে। তাকে যে এত ডাকা ডাকি সে নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথ্যা নেই তার।
হ্যারিকেন না কি একটা জ্বলছে ঘেরার ভেতরে, সেই আলোতেই অমরেশ দেখলো সেই চাহুনি। ধক করে উঠলো বুকের ভেতর টা।
'এই তো! তোকে কত ডাকচি'
এবার মুখ ফিরিয়ে ছেলেটি অমরেশের দিকে তাকিয়ে বললো
'কী?'
চোখে চোখ পরতেই অমরেশ আঁতকে উঠলো, এই মুখ ! এ কেমন দেখতে ছেলেমানুষ? এরকম দেখতে ছেলে মানুষ ও আগে কখনও দেখেনি; মুখ ময় ছরিয়ে রয়েছে আদিম কোন ব্যাথ্যা, গাল গুলো যেন তুবড়ে ঝুলে গেছে, ভয় ধরানো দুটো মরা মাছের মতো চোখ অন্ধকারেও হিরের মতো চকচক করছে; দেখেল মনে হয় চোখে কোন মনি নেয়! গা শিউরে উঠলো অমরেশের।
সে দৃষ্টি অমরেশ এর দিকে তাক করে, হাত তুলে আকাশের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে 'বৃষ্টি পড়ছে' বলে চুপ হয়ে গেল, মাথা পর্যন্ত ঘুরলো না ।
কাকে উদ্দেশ্য করে যে বললো অমরেশ বুঝতে পারলো না।
'দেকেচিস, শ্যালো এখনো চলছে তো, তুই এই ভায়ের কাচে বোস, আমি বন্দ করে দিয়ে আসি'।
অমরেশ সুকুলের থেকে অনেক খানি দূরে গিয়ে বসলো, ওর গা ভারী হয়ে গেছে, ভয়ঙ্কর অস্বস্তি হচ্ছে।
ছেলেটা এখনো ওর দিকেই কেন তাকিয়ে আছে এরকম করে?
অমরেশ অন্য দিকে মুখ করে অস্বস্তি এড়াতে একটু কাত হয়ে বসেছে। ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির ছাট এসে পড়ছে গায়ে, ইচ্ছে করেই কয়েক সেকেন্ড অন্য মনস্ক হয়ে আছে, ঠিক এমন সময় ওর মনে হলো কেও যেন ওর গায়ের খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, ঘাড় আর কানে ঠান্ডা হিমেল নিঃশ্বাস পড়ছে।
চমকে উঠে মুখ একটু সরাতেই সুকুলের মুখ ! একদম ওর মুখের সামনে, মনি হীন সাদা দুটো চোখ, লক-লকে জিভ বার করে ওকে যেন শুকছে; অমরেশ পাথর হয়ে গেছে, ভাবনা চিন্তার ক্ষমতাও নিমেশে উধাও।
ঝুলে থাকা জিভ সমেত মুখ টা কানের কাছে এনে ফ্যাস ফ্যাসে শব্দে যেন বহু কষ্টে আটকে আটকে সুকুল বললো-
'পা…লিয়ে যা…ও... পা…লাও, ও ত…ওমায় ছাড়…বেনা, তোম…আর আত তাটা…ও নষ্ট করে দে…বে।'
কি ভয়ঙ্কর অপ্রাকৃতিক সেই আওয়াজ, সহস্র বছরের প্রাচীন, শতখণ্ডে বিভক্ত এই আওয়াজে কান্না, ক্রোধ, গর্জন, হাহাকার সব যেন মিলে মিশে গেছে।
‘সম…অয় নে… ই…যা…ও যাও যাও'।
মূর্তিমান পৈশাচিক বালক আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে ওর সামনে থেকে, যেন নিজের সাথে লড়াই করছে ভেতরে ভেতরে, সেই মরা চোখের অপলক দৃষ্টি যেন গিলে খেতে চায় অমরেশ কে; অথচ সে পিছু হটছে। অমরেশের পুরো শরীর যেন শূন্য, স্নায়ু সব অকেজো, বুদ্ধি সমস্ত লুপ্ত হয়েগেছে, নিজের হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ তার বুকে বাজছে যেন বাজের শব্দ। নিমেষে সেই মূর্তি যেন বিরক্ত হয়ে ক্ষিপ্র ভয়ঙ্কর আওয়াজ করে চিৎকার করে উঠলো..
’আআআ…হ পা…লা… ও বল…ছি’
এই শব্দের মানে বোঝার আগেই ধড়মড় করে নিজের অজান্তেই উঠে পড়লো অমরেশ। কোথায় যাবে, কোন দিকে পালাবে, সে যে দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য!
হঠাৎ এক ঝটকায় সুকুল ছিটকে গিয়ে পড়লো অনেকটা দূরে, চোখের দৃষ্টি তার অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে, শরীরী ভঙ্গিমা অনেক সহজ হচ্ছে, যেন সেই অদৃশ্য পিশাচকে আটকে ফেলেছ…
'দাদা পালিয়ে যাও, এখানে থেকো না। ও পিশাচ দের রাজা, ও..ও কাওকে ছাড়বেনা।'
'চারিদিকে তাকিয়ে দেখো তুমি কোথায় দাঁড়িয়ে, এটা শ্মশান দাদা , দেখ তোমার পায়ের নিচে পোড়া কাঠ। দাদা পালাও, আমি.. আমিও বন্দি..ও..ও শ্মশান ঝিলের জল নিয়ে মন্ত্র পড়বে এবার, সে মন্ত্রে জেগে উঠবে প্রেতপুরীর সহস্র পিশাচ…সারা রাত চলবে অমানবিক দানবীয় উন্মাদনা, তোমার রক্ত চায় এদের, পালাও..নাহলে নাহলে....গররররর গররররর…
সুকুলের চোখ মুখ ঠিকরে আবার সেই ঝলসানো দৃষ্টি ফিরে আসতে লাগলো..গলার স্বর আবার আগের মতোই শত খন্ডে ভেঙ্গে হতে চাইছে, নিজেকে কষ্ট করে ধরে আছে সে, অত্যন্ত যন্ত্রণাময় গলায় বললো… ‘দক্ষিণ দিকে পালাও..গররর…পিছন ফিরে একদম দেখবে না, ওরা তোমায় ডাকবে, নানান আওয়াজে ভয় দেখাবে, আআআআহ… গররররর…তুমি দেখো না..পালাও,সোজা দৌড়াও..তারক ব্রহ্ম জপ করবে… দক্ষিণের দেওয়াল টপকে যেতে পারলেই তোমার নিস্তার। ওপাশে শ্মশান কালির মন্দির..ওখানে আশ্রয় নিয়ো।'
আ…আহ…হ্মম্মম্মম্মম্ম করে আর্তনাদ করে উঠলো ছেলেটা , নিমেশে চেহারা বদলাতে লাগলো পিশাচের দেহে.. দূরে কোথাও বিকট শব্দ কানে আসছে, একি পিশাচ মন্ত্র উচ্চারণ করছে তবে গদা ? সে কি ভয়ঙ্কর শব্দের খেলা। আকাশ বাতাস সব যেন ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছে।
হাত তুলে দক্ষিণ দিক দেখিয়ে অমরেশের দিকে নীরবে চাইলো সুকুল, সেই দৃষ্টির আকুতি, তার অব্যক্ত যন্ত্রনা হৃদয় ঝাঁঝরা করে দেয়। অমরেশ ওর হাতের দিক মেনে দৌড়াতে লাগলো প্রাণ পনে, ঝম ঝম করে বৃষ্টি পড়ছে, তারক ব্রহ্ম জপ করছে ও । কোথায় পা পড়ছে, কোন দিকে দৌড়াচ্ছে, কি আছে শেষে ও কিচ্ছু জানে না, প্রানের সব টুকু শক্তি দিয়ে সে শুধু দৌড়াচ্ছে।
পিছনে কোথাও যেন প্রলয় হচ্ছে, ভেসে আসছে সহস্র পিশাচের হাড় ভাঙা অট্টহাস্য, ভয়ঙ্কর শব্দের কান্না, প্রলোয়ঙ্কর বিকট হুঙ্কারে সব কিছুই সন্ত্রস্ত। টলতে টলতেও পা থামাবে না অমরেশ, ওকে ছুটতেই হবে দখিনের দেওয়াল অবধি। পায়ের তলার ঘাস যেন পৈশাচিক শক্তি পেয়ে গেছে জরিয়ে ধরছে পা, হাওয়াতে পিশাচের ক্ষমতা মিশে অমরেশ কে আটকে দিতে চাইছে। লম্বা লম্বা সহস্র হাত ছুটছে ওর পিছু পিছু… ‘ওই তো ওই তো দখিনের ভাঙ্গা পাঁচিল…’
ভাঙা পাঁচিল টপকে ওই পাড়ে পরতে পরতে অমরেশ শুনতে পেলো সুকুলের কাতর আর্তনাদ… ওর কানে যেন আছড়ে পরলো- 'দাদাগো… তুমি যদি বাড়ি ফিরতে পারো, হাতিপোতা গ্রামে আমার দাদাকে খবর দিয়ো'..সেই বিকট কান্নার আর্তনাদ যেন আকাশে বাতাসে বৃষ্টিতে মিলে মিশে বার বার প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো..
'আমার দাদাকে বলো..আমি গদা হারির পড়ায়, পুবের আট নম্বর আম গাছের পাশে খালে পরে আছি। আমায় যেন সে উদ্ধার করে।'
পাঁচিল টপকে ছিটকে গিয়ে অমরেশ পরেছে শ্মশান কালির মন্দিরে। ওর শরীরে আর কোনো ক্ষমতা নেই। অসাড় দেহ সংজ্ঞাহীন পরে রইলো মন্দিরের উঠোনে।
জ্ঞান যখন ফিরলো, ওর গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে, দিদির বাড়িতে বিছানায় পরে। জামাই দা, দিদি, আরো জনা কয়েক রয়েছে ওকে ঘিরে, আগের রাতের সেই বিভীষিকা সত্যি না স্বপ্ন এখনো বুঝে ওঠেনি অমরেশ। দেহ বলহীন, আড়ষ্ট, মুহূর্তে মুহূর্তে তিখরে উঠছে খালি।
দিদি কাঁদছে আর মাথায় হাত বুলিয়ে চলছে, পাড়ার পন্ডিত এসেছে মা মনসা প্রসাদ নিয়ে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল, একটু একটু করে চেতনা ফিরে পেয়েছে অমরেশ, উঠে হেলান দিয়ে খাটে বসে; দিদি ওকে বুঝিয়েছে, বাড়ি আসতে দেরি হচ্ছে দেখে, জামাই দা আর কয়েকজন বন্ধু মিলে তাকে আনতে গিয়েছিল স্টেশন, সেখানে দেখতে না পেয়ে, অনেক খোঁজাখুঁজি, শেষে অনুমান করেই দলবল নিয়ে যায় আম বাগানের দিকে, ওকে নিয়ে ফেরে অনেক রাতে।
দিন দুয়েক লেগেছে অমরেশের সুস্থ হতে, অল্প অল্প করে অমরেশের মনে পরেছে সেদিনের সন্ধের সেই অন্ধকার, সেই বিভীষিকা; সুকুলের শেষ আর্ত অনুরোধ..।ওর কথা মতো দিদির বাড়ি থেকে খোঁজ নেওয়া হলে জানা যায়, পাশের গ্রাম হাতিপতার বকুল বাস্কের ভাই সুকুল আজ চার দিন নিখোঁজ।
তারপর ও আর কিছু জানেনা, সেইদিন বিকেলে বাবা এসে ওকে বাড়ি নিয়ে যায় ।
মা দিনরাত পুজো দিচ্ছে বাড়িতে। দিদির বাড়িতেও একই খবর…।।মাস খানেক কেটে, অমরেশ তখন সেই বিভীষিকা থেকে বেরিয়ে অনেকটাই সুস্থ, জামাই দা ওকে বলেছে, ও নাকি 'কেউটি' শ্মশানে পৌঁছে গিয়েছিল সেদিন। শ্মশানের পাশেই যে আম বাগান, তার মালিকের নাম ছিল গদাধর দলুই, মাতাল গদা বাগানেই এক ঝড় বৃষ্টির রাতে বজ্রাঘাতে মরে, ওদিকে সচরাচর লোকজনের যাতায়াত নেই, তাই জানাজানি হয় অনেকদিন বাদ। ওর শবদেহ তখন শেয়াল কুকুরে ছিঁড়ে খেয়েছে অর্ধেক। বাকি পচা দেহ কেও দাহ করতে চায়নি, তাই পুঁতে দেওয়া হয়েছিল কেউটির গাবায়।
গ্রামে কান পাতলে নাকি ইদানিং শোনা যায়, এখনও ঝড় বাদলার রাতে গদা পরে থাকে রাস্তায়, যে ওর গায়ে পা ফেলে..ও তারই পিছু নেয়।
অমরেশ বুঝতে পারে সুকুল ও বোধহয় ওর মতই গদা হারির শিকার। সুকুলের প্রতি ওর কৃতজ্ঞতা আজীবন থাকবে, ওর যন্ত্রণাময় সেই চোখের দৃষ্টি আর শেষের সেই গগন ভেদী আর্ত অনুরোধ ও হইত চাইলেও ভুলতে পারেনা, মাঝে মাঝেই ওর কানে বেজে ওঠে সেই আর্ত অনুরোধ।
অবশ্য ওর দাদাদের খবর পাঠিয়ে সুকুলের পচা গলা দেহ উদ্ধার হয়েছিল পুব পারের খাল থেকে, যথেষ্ট রীতি মেনে দাহ ও সৎকার করেছিল ওর দাদারা।
****
প্রায় বছর আষ্টেক হয়েগেছে, লোক মুখ থেকে হারিয়ে গেছে গদা হারির বিভীষিকা।
নান্দাই থেকে পাকা রাস্তা এখন ভগবতী তলা, মেদগাছি, মানিকহার হয়ে উঠে গেছে কালনা বর্ধমান রোডে। প্রচুর লোকের যাতায়াত বেড়েছে, গাড়ি ঘোড়া বেড়েছে। হাঁটতে হয়না সেই রাস্তায় আর আজকাল। রিকশা চলে, টোটো চলে আরো কতো ব্যবস্থা।
এরকমই এক সন্ধেই এক মাঝ বয়সী লোক মোটর বাইকে ফিরছে ধাত্রীগ্রাম থেকে বাড়ি..বোধহয় যাবে মানিকহার, সন্ধে নেমেছে সবে। গ্রীষ্মের এই সময়ে ঠান্ডা ফুরফুরে বাতাস গায়ে লাগলে বেশ লাগে।
তিন নম্বর কালভার্ট পেরিয়ে একটু দূরে তার চোখে পরে, একটা দশ বারো বছরের ছেলে কালভার্টে বসে! 'এই সন্ধেয় বাচ্ছা ছেলে এখানে কি করছে, শেয়াল যা বেরোয় এদিকে, রক্ষে থাকবেনা যে।' কাছে এসে গাড়ি থামিয়ে জিজ্ঞাসা করে..
'কি হয়েছে বাবু তুই কোথায় যাবি বাবা? কি নাম তোর?'
কাঁদো কাঁদো গলায় ছেলেটার উত্তর- 'আমার নাম সুকুল, আমি বাড়ি যেতে পারছিনা, আমায় একটু দিয়ে আসবে কাকু?'
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন