রাস্তা
‘‘আপনার কাছে আর একটা সিগারেট হবে না কি?’’ চায়ের ভাঁড়টা ছুড়ে ফেলে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল লোকটা। আমিও হাতটা পকেটে চালান করে দিয়ে প্যাকেটের মধ্যে থেকে টেনে বার করে আনলাম একটা নির্ভাঁজ, সস্তার সিগারেট। তুলে দিলাম সবুজ জামা পরা, ঘেমো লোকটার হাতে। পকেটে সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা ঋজু সিগারেট টেনে বার করে আনায় আমি দক্ষ অনেক দিনই। যাতে পকেটে কটা সিগারেট আছে তা যেন কেউ টের না পায়।
লোকটা সিগারেটটা দ্রুত ধরিয়ে দু’টো মস্ত টান দিল। একেবারে কলকে ফাটা টান। এক ঝটকায় সেনসেক্সের মতো সিগারেটের আগুনটা নেমে এল ওই তর্জনী আর মধ্যমার কাছাকাছি। এ বার ও বিরতি নিল। সিগারেট-সহ ডান হাতটা নামিয়ে বলল, ‘‘আপনিই তা হলে সেই সাংবাদিক?’’
বললাম, ‘‘হ্যাঁ।’’
ও জিজ্ঞাসা করল, ‘‘কাগজ না টিভি?’’
বললাম, ‘‘কাগজ।’’
এ বার লোকটা আমার মুখের ঠিক পাশ দিয়ে দৃষ্টিটা ভাসিয়ে দিল পূর্ব দিকে। বলল, ‘‘গ্রামের রাস্তাটা কিছুতে ঠিক হচ্ছে না। একে ওকে বহু বার বললাম। বর্ষায় গোড়ালির উপর পর্যন্ত কাদা হয়ে যায়। এটা কোনও খবর করা যায় না?’’
এ সব দাবি দমাতে একটা টোটকা শিখিয়েছিল আমার গুরু। বলেছিল, ‘‘ওদের বল ওদেরই কোর্টে ঠেলে দিবি।’’ আমিও উৎসাহে টোটকাটা প্রয়োগ করলাম লোকটার উপর। বললাম, ‘‘এমনি এমনি তো খবর হয় না। আপনারা বরং রাস্তার দাবিতে একটা আন্দোলন টান্দোলন করুন। বিডিও অফিস ঘেরাও করুন। তা হলে একটা খবর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। না হলে বুঝতেই তো পারছেন। এ দেশে রাস্তা খারাপ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। এমনটা তো হয়েই থাকে।’’
লোকটা এক বার শেষ চেষ্টা করল। বলল, ‘‘তা হলে কিছুই কি করা যায় না?’’
আমি বললাম, ‘‘না, দাদা।’’
এর পর আর ও রাস্তা নিয়ে কথা বাড়াতে রাজি হল না। মুখের ভাব দেখে মনে হল, এ ভাবে কথা ফিরিয়ে দেওয়াটা ওর কাছে নতুন নয়।
যাই হোক, সবুজ জামার সঙ্গে আলাপের প্রথম পর্বটা এ ভাবেই চুকল। বলা যায়, কিছুটা হতাশা দিয়েই শুরু হল। ওর সিগারেট ততক্ষণে শেষ। এ বার লোকটা আমাকে বলল, ‘‘উঠুন।’’ আমিও ওই লাল ধুলো মাখা বাইকটায় চড়ে বসলাম। লোকটা গাড়িটায় স্টার্ট দিয়ে ছুটিয়ে দিল লাল রাস্তা ধরে। আমাদের যেতে হবে ওর গ্রামে। যেখানে আপাতত অনেকের নজর। গ্রামের এক মাত্র নলকূপের হাতলে চাপ দিলেই না কি বার হয়ে আসছে আতরগন্ধী তরল। কী ব্যাপার, সেটাই আমাকে সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে পাঠিয়েছেন সম্পাদক।
ওই সবুজ জামা আমার এক বন্ধুর বিশেষ পরিচিত। মাথায় ঝাঁকড়া চুল। যেন অজস্র বৃত্তে পূর্ণ। হাড়েকাঠে চেহারা। শ্যামলা বর্ণ। ভাঙা চোয়াল আর জ্বলজ্বলে চোখ। সবুজ জামা নাম বলেছিল, শ্যামা। লাল ধুলোর ঢেউখেলানো পথ পেরিয়ে সে দিন পৌঁছেছিলেন ওর গ্রামে। দেখেছিলাম ওই আতরগন্ধী তরল উগরে দেওয়া নলকূপটা। পকেট থেকে শিশি বার করে তাতে ওই তরল পুরে নিয়েছিলাম খানিকটা।
আমাদের কাগজই প্রথম বিষয়টা সামনে আনে। ফলাও করে ছাপা হয় ওই নলকূপের কথা। তার পর থেকেই দলে দলে লোক হামলে পড়ে সবুজ জামার গ্রামে। এর মঝে অবশ্য ওখানে কী কী ঘটছে সবুজ জামা আমাকে নিয়মিত ফোনে জানাত। আমিও এ দিক ওদিক থেকে আরও মালমশলা জোগাড় করে লিখে যেতাম একের পর এক ফলো আপ স্টোরি। এক দিন সবুজ জামা বলল, ‘‘দাদা, গ্রামে একেবারে ভিড় লেগে গিয়েছে। ঝাপানতলায় ওই টিউবওয়েল। ওই জায়গা কিনে নিতে চাইছে অনেকে। এলাকা গরম হয়ে আছে। ঝাপানতলা বহুদিনের পুরনো। সকলের পুজোর জায়গা। এলাকার লোক খেপে আছে।’’ আমি ওকে ফোনে পরামর্শ দিলাম, ‘‘সব কিছুর উপর ভাল করে নজর রাখ। কিছু হলেই আগে আমাকে জানিও।’’
মাঝে হঠাৎই যেন কর্পূরের মতো উবে গেল সবুজ জামা। ১০-১২ দিন ওর কোনও খবর নেই। আমার কাছে ওর একটিই ফোন নম্বর ছিল। ওকে পাগলের মতো ডায়াল করে যাই রোজ,। কিন্তু ফোন নট রিচেবল। এ দিকে ওর গ্রামে সমস্যা যে ঘূর্ণির মতো পাকিয়ে উঠছে তা শহরে বসেই আমি টের পাচ্ছি। সম্পাদক বলছেন, ‘‘ওখানকার পরিস্থিতি গরম। যে কোনও মুহূর্তে বড়সড় কিছু ঘটে যেতে পারে।’’ তাই হলও।
দিন দু’য়েকের মাথায় খবর এল, সবুজ জামার গ্রামে এখন তুলকালাম। এক দল লোক কিনে নিতে চাইছে ওই নলকূপ এবং আশপাশের এলাকা। কিন্তু সবুজ জামার গ্রামের লোক তা দিতে নারাজ। ওখানে নাকি বাইরে থেকে লোকজনও গিয়ে ডেরা বাঁধছে। লড়াই একেবারে হব হব পরিস্থিতি। মরিয়া হয়ে সেই সন্ধ্যাতেই সবুজ জামাকে ফোন করি। হঠাৎ এক ঝটকায় ও প্রান্তে ফোনটা বাজতে শুরু করে। কিন্তু কেউ ধরে না।
পর দিনই রওনা দিই সবুজ জামার গ্রামে। ঠিক যেখানে ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ি। অত ভোরেও চায়ের দোকানটা খোলা। এক ভাঁড় চা নিয়ে চুমুক দিয়েই একটা সিগারেট ধরাই। এতটা পথ পেরিয়ে আসার ধকলটা উড়িয়েই দিই ধোঁয়ার মতো। অত ভোরে আশপাশে কেউ নেই। ভাবতে পারিনি এত তাড়াতাড়ি ওখানে পৌঁছে যাব। সিগারেট শেষ করে ওর গ্রামে ঢোকার পথ ধরি। সেই লাল ধুলোয় মোড়া, ঢেউখেলানো রাস্তা। দু’পাশে অজস্র গাছ গোটা রাস্তা জুড়ে। হেঁটে হেঁটেই এগিয়ে চলি। যতদূর চোখ যায় ততদূর রাস্তাটা নির্জন। আগের বার যখন গিয়েছিলাম তখন দেখেছি, এই রাস্তা প্রায় ৫ কিলোমিটারের মতো।
খানিকটা দাঁড়িয়ে ওই রাস্তা ধরেই হাঁটা শুরু করলাম। মিনিট দশেক যেতেই দেখলাম একটা সাইকেল ভ্যান পিছন থেকে আসছে। ওকে থামালাম। তার পর উঠে পড়লাম ওই ভ্যানে। ভ্যানওয়ালা অবশ্য আগেই বলে দিয়েছিল, ‘‘টিউকলের গ্রামে যাব না। তার আগেই আমি ডানদিকে ঘুরব। ওইটুকু আপনাকে নিয়ে যেতে পারব।’’
ভ্যানে উঠেই ব্যানওয়ালাকে প্রশ্ন করলাম, ‘‘এ দিকের খবর কী? ওখানে কী ঝুটঝামেলা শুরু হল?’’
ভ্যানওয়ালা একটু থমকে উত্তর দিল, ‘‘পরিস্থিতি গরম। আপনি ওই গ্রামে যেতে পারবেন কি না জানি না।’’
কিছুক্ষণ পর একটা মোড়ে আমাকে নামিয়ে দিয়ে ভ্যানটা ঘুরে গেল ডান দিকের মোড়ে। সেই রাস্তাটা দু’পাশের জমির মাঝখান দিয়ে খানিকটা গিয়ে পৌঁছেছে একটা গ্রামে। আমি ভ্যানটার চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। সকাল তখন সাড়ে ৬টা হবে। তার পর আবার মোরামের লাল পথ ধরে হাঁটা শুরু করলাম সবুজ জামার গ্রামের উদ্দেশে।
বেশিদূর হাঁটতে হল না। হঠাৎই আবিষ্কার করলাম অত সকালেও গ্রামটায় ঢোকর কিছুটা আগে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক দঙ্গল লোক। কিছুটা এগোতেই সেই ভিড়টার মধ্যে কাউকে কাউকে চিনতেও পারলাম। এদের অনেকেই আমারই মতো রিপোর্টার। রয়েছেন ক্যামেরাম্যানও। ওরাই দেখাল, গ্রামে যাওয়ার সেই ভাঙাচোরা রাস্তাটা ইতিমধ্যেই বেশ খানিকটা খুঁড়ে বিচ্ছিন্ করে দেওয়া হয়েছে। যাতে কোনও যানবাহন না ঢুকতে পারে। আমারই সতীর্থদের মুখে শুনলাম, গ্রামের হাওয়া এখন বেশ গরম।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন