গল্পঃ সুব্রত দেওঘরিয়া

 আমার খুব থুথু ফেলার ইচ্ছে হচ্ছিল

কোনো ঘটনাই দুম করে শুরু বা শেষ হয় না। প্রপার ঘটনার আগে থাকে দীর্ঘ ব্যাকগ্রাউন্ড। সেই প্রেক্ষিত ছাড়া ঘটনা অর্থহীন। আবার যেখানে তার শেষ হয়েছে বলে মনে হয় তারপরও চলতে থাকে ঘটনার রেশ।  আসলে যাকে আমরা নির্দিষ্ট ঘটনা বলে ভাবি তা হল অনন্ত প্রবাহের একটা মুহূর্ত মাত্র। এই ঘটনাও তাই বুঝতে গেলে আখ্যানকে পিছিয়ে যেতে হবে অনেকগুলো বছর। মানে ধরো আমার ছোটোবেলায়-- যখন মা বাবা দিদি আর আমার সংসারে বাবা আমাদের গল্প শোনাত রাজকুমার-রাজকুমারী-ওয়াসালিসার, যখন প্রচণ্ড বোকা বোকা প্রশ্ন করত দিদি এবং বাবা ও পরে আমি ওর পিছনে লাগতাম, যখন রান্নাঘর থেকে চিৎকার করে মা আমাদের গল্পে যোগ দিত আর মা-বাবার গার্হস্থ্য খুনসুটিতে আমি আর দিদি খুব করে হাসতাম। তারপর আখ্যান ক্রমাগত এগিয়ে যাবে। কখনও হাঁটবে সোজা পথে, কখনও বাঁক নেবে। এক একটা শটে ক্যাচ করে যাবে আমার বেড়ে ওঠা এবং বেড়ে ওঠাকালীন বিভিন্ন কমপ্লিকেশন, সংঘাত। তবে হয়তো এই নির্দিষ্ট ঘটনার কিছু অর্থ খুঁজে পাবে তুমি। নইলে তোমার সরকারি স্কুলে শেখানো মরালিটির কনসেপ্টে আঘাত লাগবে এবং এমনভাবে নাক সিঁটকাবে যেন আখ্যানের মাঝে মরা ইঁদুরের গন্ধ ঢুকে গেছে।

 

  ছোটোবেলা থেকে দেখে এসেছি বেশকিছু গল্প আর ধারণা গিজগিজ করত বাবার মাথায়। আরো দেখেছি সেগুলো ঠিকঠাক প্রকাশ করার প্লাটফর্ম ছিল না ওর কাছে। নিপাট ভদ্রমানুষ বলে পরিচিত আর সবার সাথে হেসে হেসে কথা বলা বাবার সাকুল্যে বন্ধু ছিল তিনজন। মা দিদি আর আমি। এখন মনে হয় আমি শুধু বন্ধু ছিলাম না। ছিলাম ওর গল্পের আধার। ধারণার প্রয়োগশালা। তাই গল্প বা আড্ডা সবই ছিল মূলত আমার সাথে। বড়ো হতে হতে সেইসব গল্পের ধরণও পালটে যেতে থাকে। এমন অনেক কথাই বলত যার কিছুই বুঝতাম না তখন। শুধু শুনতে ভালো লাগত। সেই ক্রমাগত পাল্টাতে থাকা বয়সে মনে হত বাবা অন্যরকম একটা মানুষ। কী একটা গল্প বলতে গিয়ে একদিন বলেছিল বিদ্রোহের কথা। বলেছিল, যে দেশে পঁচানব্বই শতাংশ মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত যোগ দেবে না সেদেশে বিদ্রোহ হতে পারে না।  কথাটা নাকি বাবার নয়। লেনিন নামের কোনো ভদ্রলোকের। মুখ হাঁ করে গিলছিলাম কথাগুলো। সেদিন বয়স বা সম্পর্কের আর কোনো অর্গলই ছিল না। দক্ষ সাপুড়ের মতো ঝাঁপি খুলে বসেছিল বাবা। উচ্ছ্বাসে ছটফট করছিল। বয়সের তুলনায় অনেক বেশিই ম্যাচিওর্ড ভেবে নিয়েছিল আমাকে। বিড়িও ধরিয়েছিল আমার সামনে সেদিনই প্রথম। ফরাসি বিপ্লব-মার্ক্স-চিনের বিপ্লবের গল্প বলেছিল। বলেছিল চারু মজুমদারের কথা। নকশালবাড়ি। রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠেছিল মা-- আর তো কিছু করতে পারলে না। ছেলেটার মাথাটা খাও। সম্বিত ফিরতে বাবা কেমন লজ্জা পাওয়ার মতো উঠে পালায়। প্রথমটায় প্রচণ্ড রাগ হয়েছিল মা-র ওপর। বাবার প্রতিটা কথাই তখন আমার অস্থি-মজ্জায় গেঁথে থাকত। উত্তেজনা আনত শরীরে। পরে বুঝেছিলাম মা-বাবার মিষ্টি খুনসুটিও অতটা মিষ্টি নয়। তিক্ততার একটা যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে কোথাও।  মা-র প্রতিবাদও আসলে সেই যন্ত্রণাজাত। আরো পরে, যখন ক্রমশ ডামাডোল হয়ে যাচ্ছিল সব, মুগ্ধবোধের থেকে বেরিয়ে আসতে শিখে নিচ্ছিলাম আমি, শিখে নিচ্ছিলাম প্রশ্ন করতে, মূলত নিজেকে,  ইন্টারপ্রেট করতে শিখছিলাম প্রতিটা আচরণ আর বাক্য, বুঝছিলাম শুধু কথা দিয়ে বেঁচে আছে বাবা। মাথার ভেতর জমিয়ে রেখেছে পাতার পর পাতা গল্প আর থিওরি। আর সেইসবের চক্কর থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা ওর নেই। আসলে ধারণা দিয়ে তৈরি করা একটা খাঁচার ভেতর রয়ে গেছে বাবা। এবং বাস্তবে তা প্রয়োগের মুরোদও যথেষ্ট নেই।

 

   সব ব্যাপারেই নিজস্ব বিশ্বাস ছিল বাবার। পোশাকের ব্যাপারেও। ধুতি পরত। গা থাকত খালি। লুঙ্গি কখনোই না। এবং এ নিয়েও ছিল থিওরি। ওটা নাকি দেশীয় সংস্কৃতি নয়। দেশীয় বলতে ঠিক কী বুঝত বাবা, বড়ো হয়ে সন্দেহ হত আমার। মনে হত, বাস্তব ধারণাহীন থিওরি বানাতে গেলে এইসব কনফিউজনের জন্ম দেয় মানুষ। বাইরে বেরোলে ধুতির ওপর পরত ফতুয়া। শীতে শাল। যা বেশিরভাগই ফেলা থাকত কাঁধে। এখন আবছা মনে পড়ে ঢেকি, চরকা এসবও ছিল বাড়িতে। ঢেকির ব্যবহার দেখলেও, চরকা চালাতে দেখিনি আমি। একসময় নাকি চরকা কাটত বাবার জেঠু। সে গল্পও বলেছিল একদিন।  দেশ তখন উথালপাথাল। ঘরে ঘরে ছোটো ছোটো দুর্গ। দুর্গের প্রহরীরা নিরস্ত্র। খালি গা। এক পা ভাঁজ করে আরেক পা সামনের দিকে রেখে চালাত চরকা। বাবা এখন বন্দুকের গল্প বলে। চে-এর মোটর সাইকেলের কথা বলে। ক্ষমতা কীভাবে নজরদারি করে সে বিষয়ে ফুকোর থিওরি আওড়ায়। বাবার তাকে গান্ধীর পাশে থাকে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো। তার পাশে লুই আলথুজার, নাম্বুদিরিপাদ।  বাবার শরীরে বিদ্রোহের ইচ্ছে। এখন মনে হয়, বাবার বিশ্বাস আসলে ছিল খণ্ডিত। নিজেকে শুধু বিশ্বাস করাতে চাইত যে সে কিছু বিশ্বাস করে।

 

  গল্পের বাইরে কচ্ছপের মতো গুটিয়েই থাকতে দেখেছি বাবাকে আমি। মা-র জগত ছিল রান্নাঘরে। দিদি কখনো সাহায্য করত মা-র কাজে। ইচ্ছে হত আমারও। গাল টিপে দিয়ে হাসত মা। দিদির তেল চুপচুপে মাথায় দুটো বিনুনি বানিয়ে দিত। ফুলও গুঁজে দিত কখনো। বেশিরভাগই জবা। বাবা হেসে বলত, আমার ঘরে কালি এসেছে। মা বলত, লক্ষ্মী। দিদির গায়ের রঙ ছিল বেশ কালো। কথাটা একদিন বলে ফেলে কাকিমা। কারও কথা হজম করার মহিলা মা ছিল না। অথচ ভয় পেত সে কাকিমাকে। সেদিন রান্না করেনি মা। রাতে সবাই মুড়ি খেয়েছিল। মুড়ি খেতে বেশ লাগত আমার। সাথে জল আর আলু সেদ্ধ। বড়ো হলে, সাথে লঙ্কা। কখনো রেগে, কখনো হেসে মা বলত, তুই আলু-জন্মা। আমি গায়ে মাখতাম না। কিছু মানুষের কাজ থাকে দেখে যাওয়া। খুব কাছ থেকে। কোরাসের মতো। বাড়িতে আমিও ছিলাম তাই। মাঝেমাঝে দিদির থালা থেকে আলু চুরি করতাম। আলুর তলায় আঙুল ঢুকিয়ে ফুলিয়ে রেখে দিতাম। দিদি ছিল বেশ সরল। একদিন জিগ্যেস করেছিল--  হ্যা রে কলকাতা কতদূর?  নিজেই উত্তর দিয়েছিল-- অনেক, না? ইতিহাসের বই থেকে মুখ না তুলে বলেছিলাম-- পঁয়তাল্লিশ মিনিটের পথ। দিদি কোনো প্রশ্ন করেনি। এমনই বিশ্বাস ছিল তার। এখন, যখন আমি একা, একদম একা, চারটে দেয়াল আর দেয়ালে পূর্বতন অধিবাসীদের ছেড়ে যাওয়া কিছু লিখন ছাড়া আর কিছু নেই-- মনে হয় কিছু মানুষের বিশ্বাস করার বিরক্তিকর ক্ষমতা থাকে।

 

   বিশ্বাস তো করেছিলাম আমিও। বাবার চরকায়। বাবার ম্যানিফেস্টোতে। মাঝেমাঝে টলে গেলেও বোঝার চেষ্টা করতাম বাবার দোটানাকে, দ্বৈততাকে। কাকু বলত, তোর বাবা আসলে সামন্ততন্ত্রের দাস। এখনো বড়োদের সামনে চোখ ঢাকা ঘোমটা নিয়ে ঘোরে মা। পড়াশোনার বদলে গল্প হয় দিদির বিয়ের ব্যাপারে। বাবা বলত, কাকা বুর্জোয়া। আমার জ্ঞানগম্যি আরেকটু বাড়লে শুনতাম, তোর কাকা বুর্জোয়া-কমিউনিস্ট। কথাটা বলে হাসত বাবা। কাকা তখন কেরোসিনের ডিলার। লিডারও। লাল ঝাণ্ডা নিয়ে হনহনিয়ে এপাড়া ওপাড়া চষে বেড়ায় কাকা। ওর চোখ-মুখ তখন জ্বলন্ত আগুন। কাকা বলত, কমিউনিজমকে তোমার মতো তাকে সাজিয়ে রাখিনি। বাবার থেকে অনেকটাই ছোটো ছিল কাকু। অথচ বাবা তদ্দিনে ভয় পেতে শুরু করেছে ওকে।  রাজনীতির প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলত বাবা। জানাত, তোর কাকার সময় এখন।

 

   সময়টা ছিল গ্রাম দখল আর পালটা দখলের। পার্টি ছিল তখন রাফ এণ্ড টাফ। বাবার দোটানা ফোটানা বোঝার অবসর পার্টির ছিল না। চরকার উপস্থিতি বুঝিয়ে দিল রাজনৈতিক অবস্থান। আসলে রঙ, বস্তু আর পশুর রাজনীতিকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। অতএব হামলা। গ্রামের স্কুলে পড়ি তখন। একদিন ফিরে দেখি সারা বাড়ি তছনছ। উঠোনে পড়ে আছে চরকা। কিছু বোঝার আগেই তুলতে যাই ওটা। ওটার সাথে আমার অনেকটা ছোটোবেলা জড়িয়ে আছে। কতবার সুতো ছাড়াই এমনি এমনি ঘুরিয়েছি ওটা। ঐ শব্দ ভালো লাগত আমার। বাবা দেখে হাসত। আজ হাত দিতেই চেঁচিয়ে ওঠে মা। ও পাশ থেকে কাকিমা বলে-- নিব্বংশ হবি। নিব্বংশ হবি। কাকিমার কোনো ছেলেপুলে হয়নি। আমাদের ওপর ছিল ওর অসহ্য রাগ। ভয়ে পিছিয়ে পড়ি আমি। বাবার চোখে কোনো রঙ ছিল না। লণ্ডভণ্ড করার আগে পায়ে হাত রেখে প্রণাম করেছিল কাকু। বলেছিল-- পার্টির আদেশ। বলেছিল-- প্রতিক্রিয়াশীল কাউকেই রেয়াত করা যাবে না। পার্টি আনুগত্য থেকে বিচ্যুত না-হওয়ার নমুনা অবশ্য  আগেই দেখিয়েছে কাকু। পাশের গ্রামে লুট হয়েছে ওর শ্বশুরবাড়ি। তার পাশের গ্রামে ভায়রা ভাইয়ের বাড়ি। বাপের বাড়ি লুট হওয়ার দিন আলুথালু হয়ে উঠোনে বসেছিল কাকিমা। মা ডাকতে গেছিল খেতে। কাকিমা রান্না বসায়নি। চিৎকার করে উঠেছিল-- সবকটাকে শেষ করে দেব। নিব্বংশ হবি। চুপচাপ ফিরে এসেছিল মা। কাকু জানিয়েছিল-- সতর্ক আমি করেছিলাম আগেই। তারপরও কেউ না-বুঝলে--। কথাটা আর শেষ করেনি কাকু। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল। কিছুদুরে বসে দিদি তাকাচ্ছিল চরকার দিকে, না আমার দিকে, জানি না। দিদির স্থির বিশ্বাসে সেদিন আঘাত লেগেছিল কিনা জানি না তাও। পরদিন থেকেই গ্রামে ধোপা-নাপিত বন্ধ হয়ে যায়। গ্রাম সভায় বাবার বক্তব্য শুনতে চাওয়া হয়েছিল। বাবা দাঁড়িয়েছিল এককোনায় চুপ করে। কোনো বক্তব্য ছিল না বাবার। ভয়ে অথবা অনীহায় সব গল্প, সব থিওরি হারিয়ে গেছিল। আফসোস করেছিল গ্রামসভা। সম্মান করত বাবাকে সবাই। বলেছিল-- এসব করার ইচ্ছে আমাদের নেই। এতো কথার পরও কিছুই বলেনি বাবা। চুপচাপ বসেছিল কাকুও। সভা জানিয়েছিল, সাতদিন পর বন্ধ হয়ে যাবে স্নানের পুকুরও। তদ্দিনে কাকুর মদ খাওয়া বেড়ে গেছে খুব। এড়িয়ে চলতে শুরু করেছে বাবাকেও। দুটো বাড়ির মাঝে কুয়ো ছিল একটা। গ্রীষ্মকালে কমে যেত জল। গ্রামসভার পর থেকে কাকু আর জল তুলতো না কুয়ো থেকে। অলিখিতভাবে ওটা দিয়ে দিয়েছিল আমাদের। কাকিমা শুধু মাঝেমাঝে চিৎকার করে উঠত-- নিব্বংশ হবি। সব নিব্বংশ হবি। পরে, অনেক পরে, ঐ কুয়োতেই একদিন সকালবেলা ভেসে উঠেছিল কাকিমার লাশ।

 

  নিজের ভেতরই ক্রমশ কুঁকড়ে যেতে থাকে বাবা। আর কোনো গল্প বলে না আমাকে। হয়তো বুঝতে পারে কোনো গল্পই বিশ্বাস করব না আমি আর। হয়তো বা টলে গেছিল নিজেরই বিশ্বাস। বুঝতে পেরেছিল খণ্ডিত বিশ্বাস দিয়ে আখেরে হয় না কিছুই। এক ঝটকায় থম মেরে যায় সারা বাড়ি। আর কোনো বোকা বোকা প্রশ্ন করে না দিদি। চুপচাপ কাজ করে যায় রান্নাঘরে। মা মাঝেমাঝে দিদির দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলে। ধোপা-নাপিত বন্ধ থাকলে বিয়ে হবে না দিদির। স্কুল যাই আর আসি আমি। পড়ায় মন বসে না। দু একবার খেলতে গিয়ে দেখেছি বাকিরা সব কেমন ভাবে তাকায় আমার দিকে। ছোটোবেলার বন্ধু-কাকু-জেঠুরা সব অপরিচিত হয়ে যায়। বড্ড ইমম্যাচিওর মনে হয় সবাইকে। আর কেউ ফুল আনে না দিদির জন্য। চুপচুপে করে তেল দিয়ে এখনো মাঝেমাঝে ওর চুল বেঁধে দেয় মা। কিন্তু চিরাচরিত ঠাট্টাগুলো হারিয়ে গেছে। বাবা আর কালি বলে ডাকে না ওকে। অতএব প্রতিবাদ করে মা-ও লক্ষ্মী বলে না। সারাদিন উঠোনে বসে বসে একরাশ শূন্যতার দিকে তাকিয়ে থাকে বাবা। সারাটা বিকেল আমিও ঘুরে বেড়াই একা ফসল কাটার পর শুকনো খেতের ভেতর দিয়ে। কিন্তু শূন্যতায় মানুষ আর কতদিন থাকতে পারে। গ্রামে পরব আসে পরব যায়। পুজো আসে পুজো যায়। খাঁচার ভেতর স্থির হয়ে বসে থাকি আমরা। শেষে একদিন বাবা ডাক দেয় মা-কে। সেই ডাক শুনে কী ভেবেছিল মা? ভেবেছিল কি যে আবার একটা সংসার সংসার খেলা শুরু হবে? তিন ফেরের পৈতে নিয়ে পিঠ চুলকাতে চুলকাতে ভরদুপুরে বাবা বলবে, এক কাপ চা দাও না-- আর মিথ্যে গাম্ভীর্য নিয়ে মা জানাবে, যখন তখন চা হবে না। আমি কি চাকর নাকি! ততক্ষণে প্রস্তুত হয়ে যাবে চা। মা যেন বাবার আবদারের অপেক্ষায় ঘুঁটি সাজিয়েই রাখত। আবারও মেয়ে ফুল দেবে খোঁপায়। মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করা ছেলেটা পড়বে মন দিয়ে। অথচ সেসবের ধার দিয়েও হাঁটেনি বাবা। এক চূড়ান্ত অহং বাবাকে বাধা দিচ্ছিল কাকুর কাছে দাঁড়াতে। যদিও  জানত একবার গিয়ে দাঁড়ালে মিটে যেতে পারে অনেক সমস্যা। তাই বাবা প্রস্তাব দেয় মা-ই যাক। কতদিন আর বেঁচে থাকা যায় এভাবে সেঁদিয়ে থেকে? মা-ও যেন মুঠোমুঠো কান্না জমিয়ে রেখেছিল বহুদিন থেকে। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। হয়তো থিওরি ভেঙে বাস্তবে পা রাখতে চাইছে একটা মানুষ তা দেখে আনন্দই পেয়েছিল। তাছাড়া রান্নাঘরের বাইরেও সংসারে তার গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার খুশিও এ কান্নার কারণ হতে পারে।

 

  সম্মানজনক সন্ধির শর্ত নিয়ে ফিরে আসে মা। বাবাকে ফেলে দিতে হবে চরকা। মিটিং মিছিলে যেতেও পারে। নাও পারে। গেলে ভালো হয়। উঠে যাবে সমস্ত ফতোয়া। অথচ মা-র চোখে সেদিন যুদ্ধ জয়ের কোনো সংকেত ছিল না। ছিল শুধু আপোষের গল্প। তারপর ক্লান্ত শরীর টেনে অসময়ে শুয়ে পড়ে মা। কাকার বন্ধ ঘরে কী হয়েছিল আমি জানি না। সেদিন সারা সন্ধে আকুলিবিকুলি আমাদের অভিশাপ দিয়েছে কাকিমা। সেদিন প্রথম কাকিমার চিৎকারের সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল কাকু। আর আমি, কি জানি কেন, দেখতে পাচ্ছিলাম শৈশবে দেখা মায়ের স্তন। দেখতে পাচ্ছিলাম, ধুতিটা কোনোরকমে বাঁধতে বাঁধতে পালিয়ে যাচ্ছে বাবা। সে পালানোর শেষটা আর দেখতে পাইনি কোনোদিন। পালাতে পালাতে বাবা  একটা ছোট্ট বিন্দু হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সেই বিন্দু আর হারাচ্ছিল না। বহুবার কাপড় কাচার পরও অস্পষ্ট উপস্থিতির মতো একটা দাগ হয়ে থেকে গেছিল বাবা। ক্রমশ বাড়ছিল মা-র কাকুর বাড়িতে যাতায়াত। রান্নাঘরে মা-র পাশে চুপ করে বসে থাকত দিদি। শুধু মাথার চুলে তেল থাকত না আর। বিনুনি থাকত না পিঠের দুপাশে লতানো সাপের মতো। বাবা মাঝেমাঝে তাকাত আমার দিকে। মা মাঝেমাঝে তাকাত আমার দিকে। আমার দিকে তাকিয়ে থাকত দিদিও। আসলে সবাই তাকাতে চাইত একটা স্থির বিশ্বাসের দিকে। তাদের চোখেমুখে কোথাও প্রতিশোধের ইচ্ছে দেখতে পেতাম না আমি। তারা মাধ্যমিকে ব্লকের সেরা রেজাল্ট করা ছেলেটাকে খুঁজে চলেছিল। তারা খুঁজে চলেছিল ছোটোখাটো চেহারার একটা ভবিষ্যতকে। কলেজে যাবে ছেলেটা। ইউনিভার্সিটি। তারপর একটা চাকরি। তারপর ততটাই মেরুদণ্ড সোজা করবে ওরা যতটা মাঝারি মানুষ করতে পারে।

 

  গ্রীক কোরাসও কখনো ঢুকে পড়ে চরিত্রের ভেতর। ভালোবাসে অন্যান্য চরিত্রদের। ঘৃণাও করে কখনো বা। তারপর একদিন সে পাঁচ শতাংশ মানুষের কথা ভাবে। ও জানে এই পাঁচ শতাংশ সমস্ত অবস্থাতেই গোঁয়ার থাকে। রুখে ওরা দাঁড়াবেই। অথচ সেই পাঁচজন ভেঙে আছে হাজারটা ভাগে। তাছাড়া সেখান থেকে বিচ্যুত সদস্যের সংখ্যাও নেহাতই কম না। এই পাঁচকে এককাট্টা করে পঁচানব্বই বানানোই আসল খেলা। ইদানিং সাদা ধুতিতে হলুদ রং লাগিয়েছে বাবা। এই রং হয়তো একদিন গেরুয়া হবে। তিনফেরের পৈতে হয়েছে  নফের। তুকতাকও শুরু করেছে কিসব। এ গাঁ, ও গাঁর লোক আসে খোস-পাঁচড়া নিয়ে। বাবার ওষুধের নামডাক ছড়িয়েছে চারধারে। কেউ কেউ পায়রা নিয়ে আসে। বাবা কেটে ফেলে পায়রার গলা। তখন বাবার মুখে জিঘাংসা ফুটে ওঠে। অবশ্য তা বড়ো সাময়িক। বাবা হয়তো এখনও ভেতর ভেতর পায়রার ছটফটানিতে ব্যথিত হয়। হয়তো সিরিয়াসলি গেরুয়া নেওয়ার কথা ভাবে। বাবার গেরুয়া পালানোর প্রতীক। পায়রার মাংস দিয়ে গোল গোল ওষুধ বানায় মা। কিছুটা মাংস সরিয়ে রেঁধে খাওয়ায় আমাকে, দিদিকে। দিদির হয়তো এখনও স্থির বিশ্বাস যে তিনশ কিলোমিটার দূরের এই অজগ্রাম থেকে কলকাতার রাস্তা বাস্তবিকই পঁয়তাল্লিশ মিনিটের।

 

 রাগ শুধু বাড়তে থাকে আমার। নিস্ফল রাগ মাঝেমাঝে হতাশার জন্ম দেয়। হতাশা থেকে আসে জিঘাংসা। ইয়োর অনার, এদের কেউ শুধু কথায় বেঁচে থাকে। কেউ নিশ্চুপ আপোষে। পঁচানব্বই শতাংশের স্বতঃস্ফূর্ত জেগে ওঠার ধার এরা ধারে না। আর তখন পড়ে থাকবে যে পাঁচ শতাংশ সেই প্রতিক্রিয়াশীল দলে থাকার সাহস এদের নেই। এরা না ধর্মে, না জিরাফে।  এদের যাদের আপনারা নিরীহ ফুলকপি কেনা, কানা বেগুন কেনা সাধারণ মানুষ ভাবেন এরা আসলে শুধু নুইজেন্স নয়, এরা মারাত্মক বিপজ্জনক কারণ এদের কোনো অবস্থান নেই।  সবকটা ছায়াশত্রু। তাই অপেক্ষায় ছিলাম ওদের ঘুমিয়ে পড়ার। কী নিরীহ লাগছিল ওদের ঘুম। যেন নিশ্চিত বিশ্বাসে ম্যাকবেথের পাহারায় ঘুমিয়ে আছে রাজা ডানকান। কিন্তু মনে রাখবেন খুনী ম্যাকবেথ যদি অপরাধী হয়, ডানকানও তাই। খোলা চোখে দেখতে না-পাওয়াকে অন্ধত্ব বলে না। বলে অপরাধ। আর প্রতিক্রিয়াশীলদের থেকেও ভণ্ড লিবারেল আর আপোষবাজ মানুষের অপরাধ জঘন্য। কোনো দ্বিধাই আটকাতে পারেনি আমাকে। ছিল না, এখনও নেই, ম্যাকবেথের মতো কোনো অপরাধবোধ। বিছানার তলা থেকে বের করে আনি পায়রা কাটার বটিটা। এক এক করে তিনজনের গলায় বসিয়ে দিই। ফিনকি দিয়ে বেরচ্ছিল রক্ত। গরম, তাজা। এবার নিশ্চয় জেগে উঠবে ওরা। বিপ্লবের দিনে।

 

 আর কোনো কথা বলতে দেওয়া হয়নি আমাকে। টেনে নিয়ে যায় পুলিশ। যেতে যেতে দেখতে পাই কলমের মুখ ভেঙে ফেলছেন বিচারক। ওর চোখে তখন পায়রা কাটার মুহূর্তের অসহায় জিঘাংসা। সামান্য ক'টা মুহূর্তের জন্য। তারপর বাবার মতো শান্ত। আমার খুব থুথু ফেলার ইচ্ছে হচ্ছিল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

  একটি   লড়াকু   পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল, চিরঞ্...