চন্দনকাঠের সেই অলীক বাক্সটি
শেষ কলকাতা বইমেলায় 'ঋত' প্রকাশ করেছিল শ্রীপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'চন্দনকাঠের বাক্স।' 'পাখিজন্ম', 'বসন্ত', 'কষ্টকুসুম', 'ভেন্টিলেটর', এমন ছেষট্টিটি কবিতার মণিমুক্তো সযত্নে সঞ্চিত রয়েছে এই প্যান্ডোরার বাক্সটিতে। নিঃশব্দসঞ্চারী অনুভূতির শব্দরূপ দিয়ে শ্রীপর্ণা সুচারুভাবে নিজেকে প্রকাশ করেছেন তাঁর এই বইটিতে। আশ্চর্য রূপক হয়ে সেইসব কবিতায় '...ডানাওয়ালা পরী আসে, রাজা আসে, রানি আসে/ পাপ আসে'। সুতোর মতন সাঁকো; চিলেকোঠা এমনকী বারান্দার পাশে নিঃশব্দে এসে দাঁড়ায় শববাহী গাড়িও! 'চিত্রকর' কবিতায় আকাশ আঁকতে নীল রং এনে বাবুই পাখিকে তিনি আকাশ জুড়ে বাসা করতে দেখেন। সেই নীড়ে জোনাকিরা জ্বলে, সবুজাভ নীল আর কবির আঙুলে লেগে থাকা আকাশের রং কখন যে ধুয়ে যায়,ভেসে যায় যমুনা কল্লোলে। কবির প্রায় সবকটি কবিতাতেই ভেসে আসে দূরাগত চন্দনের ঘ্রাণ, সীমাহীন দূরত্বের অলীক অন্ধকার আর নিজের ভুবনের আলো অন্ধকারে সযত্নে তুলে রাখা স্মৃতি-সত্তা-ভবিতব্য, প্রেম ও বিরহের ধারাপাত।
'শ্বাস নেওয়ার মতো অক্সিজেন পৃথিবীতে বাড়ন্ত এখন...'
কাব্যগ্রন্থের প্রথমা 'বসন্ত'; কবিতাটি পড়তে পড়তে কোথাও এক রহস্যলীন দৃশ্যকাব্যের জন্ম হয় পাঠকের মনে। তাঁর সরস্বতীকে কখনও খুব চেনা এক মৃন্ময়ী মনে হয়, আবার কখনও সেই মাটির প্রতিমাকে রূপান্তরিত হতে দেখি দেবীত্বে। যখনই 'ঘুম ঘুম ঘোর কাটিয়ে আধো-ঘুমে' চরাচরে চোখ মেলেন তিনি, হৃদয়ে নববসন্তের ঢেউ খেলে যায়। সোনার কৌটোয় কচুপাতায় মুড়ে রাখা কতকালের সব বন্দিনী বাসনারা পদ্মসরোবরের অতল থেকে যেন ক্ষণকালের মুক্তি খুঁজে পায়। ময়ূরপঙ্খী নৌকা হয়ে তাঁর কবিতা একে একে ভেসে যেতে থাকে স্বপ্নদরিয়ার ইচ্ছেস্রোতে...
বাসন্তী শাড়িতে অভিসারিকা শ্বেতার পরনে 'লাল কাঁচুলি' অনন্য এক মুগ্ধতা তৈরি করে। কামনার ঈপ্সিত রঙে রঞ্জিতা সেই দেবীর পিঠের অনাবৃত অংশটি বুঝি প্রশ্রয়ের খোলা বাতায়ন, প্রেমের পবিত্র 'পীঠস্থান'! কখন যে পাঠক মোহমুগ্ধ মধুকর হয়ে বসন্তের প্রণোদনায় আনমনে গুনগুনিয়ে উঠবেন সে কথা বুঝি তিনি নিজেও জানেন না। পিঠের খোলা অংশটি যেন কবিতাটির আলেয়া সংকেত। অনেকখানি স্পেস রেখে পাঠককে নিজের মত করে ভাববার অবকাশ দিতে চায়। এই স্তবকে এসে আকাশগঙ্গায় উথলে ওঠে ভালোলাগার হঠাৎ ফেনিল ঢেউ! জীবনের ফেলে আসা সবকটি বসন্তের নোঙরছেঁড়া ইচ্ছেগুলো এরপর অভীপ্সার পাল তুলে প্রস্তুতি নিতে থাকে রূপসাগরে পাড়ি দিতে, একে একে ভেসে যাবে কোন এক চিরবসন্তের দেশে, সুস্বপ্নের মনোভূমে। উপাখ্যানের আধ্যাত্মিকতা দিয়ে শুরু হয়ে লৌকিক আখ্যানে শেষ হওয়ার এই রূপবদলের ধারাটি শেষমেশ কবিতাটিকে অলীক ও রহস্যময় করে তোলে। কবিতায় দৈবী শৃঙ্গার-অধিষ্ঠান-ভ্রমণ-রন্ধন সবকটি পর্বের বর্ণনা বেশ রূপকধর্মী হয়ে উঠেছে। শেষ হয়, 'ভ্রমণকালে দেবী সরস্বতীর পিঠের অংশ/খোলা রইল বসন্তের বাতাস, মধুকর আর/কয়েকটা অপ্রকাশিত কবিতার জন্য।' (বসন্ত)
'এলোমেলো পর্দা সরিয়ে সূর্যের দ্বিতীয় আলোর রেখা/ মাটিতে আসন পাতে...'
দূরত্বকে আলোকবর্ষ দিয়ে পরিমাপ করা হলে সেই দূরত্বও কখন যেন বিরহের স্পর্শ পেয়ে আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে কিন্তু সেই দূরত্বে অনতিক্রম্য বিচ্ছেদ যোগ হলে বিরহী হৃদয়ে পাথরের ভারী একটা পর্দা তৈরি হয়, শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসে কবির। নিজের বিষাদলিপিতে অভিমানী তিনি লিখে ফেলেন, 'দূরে যেতেই পারো, একটু নয় সরেই দাঁড়াই।' ক্রমশ অস্পষ্ট আবছা হয়ে যাওয়া স্মৃতিমেদুর দূরত্ব তাঁর কাছে ঘন কুয়াশার প্রহেলিকা হয়ে উঠলে তিনি নির্মোহ হৃদয়ে অনিরুদ্ধ আলোবাতাস প্রার্থনা করেন। এভাবেই দীর্ঘশ্বাসকে 'চেনা সাহচর্যে' আর সহমর্মিতার অম্লযানে ভরিয়ে তুলতে চান কবি। 'কোথাও কোনো দীর্ঘশ্বাস পড়লে/ যেন আলপথে গিয়ে তার নিচে হাত রাখতে পারি', স্বগতোক্তির মত কবি একথা শোনান। 'আলপথ' শব্দটি এখানে হয়ে অর্থময়তায় হয়ে ওঠে বিবিধার্থক। বিরামচিহ্নের মতো ছোট ছোট শ্বাস ফেলে এভাবেই তাঁর কবিতায় সূচিত হতে থাকে দূরত্বের মহিমা।
'শোকমিছিলে মোমবাতি জ্বলে থাকে/ নিভে যাবার জন্য'
অলীক এক হরিতকী বন, সেখানে বয়ে চলে সবুজাভ আশ্চর্য হাওয়া। আর এই আলোহাওয়ার ইথারে ইথারে বনের বাঘটি হরিণের গন্ধ পেয়ে যায়। কিন্তু হরিণও ঠিক সেই মুহূর্তে তার কাঙ্খিত ঘাসের সন্ধান পেয়ে যায়। এই পর্বে অদ্ভুত এক দৃশ্যান্তরও ঘটে। 'মাটির গভীরে' পৌঁছে 'ঘাসের শিকড়ে টনটন করে খাদ্যের টান।' এরপরে একসময় 'পত্ররন্ধ্র' থেকে বের হওয়া ধোঁয়ায় 'গেরস্থের ভাত রান্না হয়।' আশ্চর্য ভাতের গন্ধে চারদিক ম' ম' করে উঠলে কখন যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে দালির আঁকা সেই রৌদ্রকরোজ্জ্বল সমুদ্রতট। দেখা যায় সূর্যের প্রখর তাপে গলে সমুদ্রে মিশে যেতে থাকা মোমের ঘড়িটিকে।
'ইচ্ছে ছিল করতলের মেঘ/ইচ্ছে সে তো ইচ্ছে হয়েই শেষ'
শ্রীপর্ণার দশ পংক্তির 'রান্না' কবিতাকে কখনও রূপকথা ভেবে ভুল করতে ইচ্ছে হয়। পরাবাস্তবের চোরাস্রোতে ভাসতে ভাসতে কীভাবে যেন এক সুররিয়ালিস্ট আবহ তৈরি করে ফেলে তাঁর এই কবিতা। অনেকটা বিস্তৃতি পেতে থাকে। হরিতকী বনের আশ্চর্য সবুজ আভাময় হাওয়ায় একের পর এক ঘটে চলা অপ্রত্যাশিত দৃশ্যান্তর, চমকে দেওয়া রূপকের মায়াজাল কবিতাটিকে এক জাদুনগরীতে পৌঁছে দেয়। স্বতন্ত্র মাত্রা এনে দেয়, যা সম্ভবত ভাল কবিতা হয়ে ওঠার আবশ্যিক শর্তও। অনন্য স্বপ্ন-বাস্তবের রেসিপি দিয়ে তৈরি পঞ্চব্যঞ্জনের স্বাদগন্ধে শ্রীপর্ণা এই কবিতায় তাঁর পাঠকের রসনা পরিতৃপ্ত করতে সমর্থ হন। সহজিয়া বোধশব্দের এই রূপকধর্মী কবিতাটি পাঠককে নিবিষ্ট মনসংযোগে প্রণোদিত করে।
'বৃথাবৃক্ষে ভালোবাসা দিলে/ চন্দনের গন্ধ পাওয়া যায়'
কি না দিতে পারে ভালোবাসা? চোখে চোখ রেখে প্রেমের কবিতা শোনালে জন্মান্ধ দৃষ্টি ফিরে পায়। পথভোলা একাকী পথিকের সঙ্গে শুধুমাত্র ভালবেসেই বহুদূর পথ হেঁটে আসা যায়। 'পথ যদি রাস্তা ভুলে গিয়ে/ কাউকে একলা ফেলে যায়,/ ভালোবেসে তার পাশে গেলে/ সেখান থেকেও হাঁটা যায়।' (ভালোবাসা)
শেকলকেও পলকে হালকা এক পালকে রূপান্তরিত করে সেই ভালোবাসায় ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায় কবির একান্ত আকাশে। 'নিভৃত চুম্বনখানি জলে ভেসে যায়/ ওর কোন ভূমি নেই, নেই ঘরে ফেরা।' (বাস্তুহারা) শ্রীপর্ণার ক্রমিক মেঘ-রোদ-বৃষ্টির এই ম্যাজিক শো দেখতে দেখতে কখন যেন প্রণয়-বিরহ-বিচ্ছেদের অপরূপ আলোয় ভরে ওঠে আমাদের কবিতার পাঠভুবন।
'শ্বাস যেন সাহচর্যের চেনা গন্ধ পায়'
একটা অদৃশ্য হাত প্রতিটা হাতের মধ্যেই থাকে, আঙুলের ভেতরে ভেতরে অন্য অদৃশ্য এক আঙুল। সেই আঙুলের জাদুস্পর্শে হৃদয়ে মৃদঙ্গ বেজে উঠেছিল বুঝি কোনো ধূসর অতীতে? সেইসব স্মৃতির ছিলাটানে কেউ যেন আজ এই অবেলায় খোলা ছাদে একা এসে দাঁড়িয়েছে। ধূ ধূ মাঠে দাঁড়িয়ে রয়েছে খুব একা হয়ে যাওয়া কেউ! চোখের ভেতরে থাকা যে অন্তর্লীন চোখ, ঠোঁটের ভেতরে রাখা আরও এক স্পর্শাতুর ঠোঁটের স্পর্শ পাওয়াটা বুঝি ছিল গতজন্মের প্রাপ্তিযোগ। এই প্রশ্নে ভালোবাসার অশ্রুবিন্দু যখন পদ্মপাতায় টলোমলো, কবির হৃদয়ও তখন যেন চেনা সেই বাতাসের স্পর্শে এলোমেলো হতে থাকে। তাঁর আতুর হৃদয় অনিবার্য প্রশ্ন তোলে 'প্রতিটা হাতের মধ্যে থাকে আর একটা হাত।/ আঙুলের ভেতরে ভেতরে অন্য আঙুল।/ তুমি কি সে আঙুল ধরেছিলে?/ তাহলে কিসের টানে ধু ধূ মাঠে/ একা বসে আছি?' (পরকীয়া)
সেই অন্যরকম হাতটা কিন্তু শেষ পংক্তিতে এসে অসংবৃত হয়ে ওঠে। প্রণয় প্রার্থনা আর হৃদয়ের আকুতি কোথাও যেন সমান্তরাল হতে থাকে।পাশাপাশি,হাতের কাছেই, তবু স্পর্শাতীত সেই অবস্থান। সংকেতময় হৃদয় সংশয়ের আবর্তে পড়ে, প্রশ্ন তোলে, 'যদি সেই হাতই না পাতো/ যে হাতটা অন্যরকম/ তাহলে হে পূর্ণকলস কীসের এই বৃথা আয়োজন?' কবির এমন সঙ্গত প্রশ্ন পাঠককেও নিশ্চিত বিদ্ধ করবে,ভেজাবে। 'পরকীয়া' এমনই এক আবছা জ্যোৎস্নালোকিত পদ্য যা পাঠককে অচিরে চন্দ্রাহত করে তোলে। কাকজ্যোৎস্নায়, দিগন্তের আলোআঁধারিতে, অদৃশ্য মায়াটানে পাঠককে কেবলই টানতে থাকে সংশয়ঘন সেই নিশিডাকে। পাঠশেষে সম্মোহিত পাঠক যেন সেই পুরনো ভালোবাসাকে নতুন করে ভালোবাসতে শেখেন। অনুভবের যা কবির কাছে নিছকই 'পদ্মপাতায় জল'।
'কী আর করার থাকে মনে পড়ে না যখন!'
তিনি কখনও আবার প্রণয়িনীর লাস্যে আবেগঘন মুহূর্তে বলে ওঠেন, 'ঠোঁটের ওপরে রাখো ঠোঁট/হাত দুটো ধরো শক্ত করে;/ আলিঙ্গনে আবদ্ধ রেখো/ মন যদি টলমল করে।' আবার পরক্ষণেই সেই ঠোঁটে অভিমান উপচে পড়ে, 'যেতে যেতে দিন যদি পোড়ে/ জল ছেড়ে চলে যেও দূরে।' আবার এই তিনিই পুনরুজ্জীবন প্রার্থনায় লেখেন, 'পদ্মপাতা জলবিন্দু আগলে আগলে রাখে/ কাচপোকা টিপের আড়ালে রেখে দিই/ একফোঁটা মধু। ডুবন্ত হলদে বেলায়/ ঘাসফড়িংয়ের পায়ে, ডানায় ডানায় হলদে/ অমৃত রেণু। জীবন তো একবারই/ জীবন তো এটুকুও চায়; জীবন তো/ এটুকুই চায়।( অমৃত)
জনান্তিকে কবির ব্যাকুল প্রশ্ন, 'তোমাদের বুঝি নদীটি খরস্রোতা?/ আমার আবাস দেশলাই বাক্সতে।/ বিন্দু বিন্দু বারুদ করেছি জড়ো/ তুমিও আগুন লাগিয়ে দিয়েছ তাতে।' সে আগুনে 'ঘাসফড়িংয়ের ডানা, কাচপোকা রং টিপ' পুড়ে গেলেও মরণোন্মুখ কবি লেখেন, 'তবুও জলের গন্ধে পেতেছি ঘ্রাণ,/ এমনই বেহায়া আমার ঘ্রাণেন্দ্রিয়।....তুমি বুঝবে না কোথায় কতটা গেল।/ তুমি বুঝবে না কতটুকু থেকে যায়।/ আগুন বোঝে না জ্বলে ওঠবার আগে/ বারুদও একটু জলের কাঙাল হয়।( জলজ)
নদী তার নিজের নিয়মে গতিপথ পালটায়,তীরে জমা হতে থাকে স্মৃতি-বালুরাশি। নিজের বলতে থাকে একটুখানি দিগন্ত, দূর থেকে আরও দূরে,ছায়াপথে পা ফেলে ফেলে চলাতেই নির্মিত হয়েছে তাঁর অলীক কবিতার ভুবনটি। তারপর একসময় পদচিহ্ন সরে সরে গেলে 'অস্তরাগ গোধূলিবেলায়' সেই উদাসীন আকাশে তারারা ফোটে। বেনেবউ 'সন্ধ্যাকালে শূন্যডালে' একাকিনী এসে দাঁড়ায়। নিঃশব্দে রাত আসে, জানলা হয়ে ওঠে বাতাস নিরুদ্ধ এক গরাদ। পাঠকের ভাবনা এই পংক্তিতে পৌঁছে এক অজানা আশঙ্কায় ডানা ঝাপটাতে শুরু করে। কিন্তু তারপর অলীক সেই মুহূর্তে পঞ্চমীর চাঁদ কবিতার শরীরে টুকটুকে লাল রঙের একটা ফল বয়ে আনে। যে ইপ্সিত ফলে সজল-সুফলা হয়ে ওঠে দেহজমি, দুধধান ফুলিয়ে ওঠে,পাখি খড়কুটো বোনে... এমন কবিতায় রয়েছে শরৎ মেঘের বৃষ্টিধোয়া গোধূলির প্রচ্ছায়া। আবছা রঙিন আলোয় দেখা যায় নদীতটে জমে ওঠা বালিপাহাড়, প্রান্তরময় ছড়িয়ে থাকা অজস্র ঝরাপাতা আর দীর্ঘশ্বাসের মতো সেই প্রতীকী গরাদটিকে। পাঠক এখানে বিদ্ধ হতে গিয়ে একসময় মুগ্ধ হন, নিঃশর্তে ভালোবেসে ফেলেন সেই লাল রঙের দৈবী ফলটিকে। এই বুঝি মরুতৃষ্ণা,অথবা নিমগ্ন আত্মরতি! এই কি স্বর্গের বাগানে ঈভের আধ খাওয়া সেই ইচ্ছেফল? পাঠককে হাত পাততে হয় অভিপ্রায় রঙের অপার্থিব এই ফলটিকে পেতে।
সত্যিই যদি এমন হয়? হীরের দ্যুতি নিয়ে করতলের জল যদি জিজ্ঞাসা করে, 'এ কেমন?' ঝিকমিক করে ওঠে তার অমৃত কলসখানি, পলাশের পাপড়ি ভেসে যেতে যেতে স্বপ্নপূরণের ঢেউ তোলে। সত্যিই এমন হলে নিঝুম দুপুরে একলা পাখি বুঝি নিজেকে গ্রহণীয় করে তোলে, 'আদিগন্ত' স্নান সেরে নিঃশর্তে সমর্পণের ইঙ্গিত দেয়, বলে 'আসতে পারো'! আর তখনই কোথাও, 'আলোকবর্ষ দূরে কোন কোন তারা ডাকে/ চন্দন বৃক্ষটি বলে আয়, আয়, আয়।' (আহ্বান)
কবিতাটির এই চিত্রকল্প থেকে জন্ম নিয়েছে প্রকৃতি মিলনের অবারিত আকাঙ্ক্ষা। জল-রোদ-নিঝুম দুপুর-পালক-পলাশ সবাই যেন নিজের নিজের ভূমিকায় অনিবার্য, অনন্য হয়ে উঠেছে, সেই গাছতলা, 'দুপুরের একলা নিঝুম ঘাট!' পাথুরে সিঁড়ি ছুঁয়ে থাকা পরমা নদীটির ছলাৎচ্ছল। কিন্তু ভালোবাসা নিজেরই ছন্দে অস্তাচলে গেলে তখন সেই স্রোতস্বিনীর রূপান্তর ঘটে, সে নিজেকে সংবৃত করে, বাঁধ দিতে চায় নিজের তিরতিরে ছন্দে। ভালবাসার কাছে পৌঁছানো আর হয়ে ওঠে না তার! স্বগতোক্তি শুনি, 'দুয়ে দুয়ে চার হতে দেখেছো কখনো?/ আমার হাতে যে সব শূন্য হয়ে যায়।/ পড়ে থাকা নিঃস্ব করতল/ সযত্নে অশ্রু মোছায়।'(অঙ্ক)
'এক এক বর্ণের এক এক রকম গন্ধ/ জিভে নিলে এক এক রকম স্বাদ'
কবিতার নির্মাণ প্রসঙ্গে কবি নিজের শব্দ সংগ্রহ সম্পর্কে তাঁর কবিতাতে জানিয়ে দেন, 'আমি আমার সঙ্গে একটা আঁচল রেখে দিই। / বাংলা বর্ণমালা জড়ো করি তাতে। এ বাড়ির বারান্দা, ও বাড়ির রান্নাঘর বর্ণ দেয়।/ শব্দ দেয় বহুদিন বন্ধ থাকা/ চিলেকোঠা ঘরের জং ধরা তালা।' কখনো তিনি শব্দ খুঁজে নেন 'অফিসফেরত কিছু ক্লান্ত মুখ থেকে,/ মফস্বলের ট্রেন, সকালের সবজিবাজার আর/ জলকাদা মাছের বাজার, আর আরও পাশে/ চট পরে বসে থাকা পাগলের অপরিষ্কার/ মুখের ওপরে ঝরে পড়া স্বর্ণাভ রোদ্দুর থেকে'। (বর্ণমালা)
কবি নানান আকারের বর্ণের স্বাদগন্ধ চয়ন করতে পারেন 'হাসপাতালের পাশে, স্কুলঘর পেরোতে পেরোতে'। শৈশবের স্কুলঘরের স্মৃতি থেকে বর্ণমালা খুঁজে নিয়ে নিঝুম রাত্তিরে সেইসব বর্ণ-শব্দ-বাক্য দিয়ে পংক্তি সাজাতে সাজাতে কখনো বহুদিন বন্ধ থাকা চিলেকোঠা ঘরের পাশে ছাদে গিয়ে দাঁড়ান, দেখেন সদ্য ঋতুমতী এক কিশোরী একবুক অভিমান নিয়ে জানলার গরাদ ধরে অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে রয়েছে, 'এভাবেই শব্দ-বর্ণ-বাক্য সাজাতে সাজাতে' তাঁর কবিতাও প্রাণ পায়, 'অশ্রু হয় কেউ, কেউ আপনি গুড়িয়ে যায়।' শ্রীপর্ণা সম্ভবত স্মৃতির সম্ভার থেকে নির্মাণ করে নেন তাঁর কবিতা। এগুলি তাঁর একান্তই নিজস্ব, আঁচলা ভর্তি বকুলফুলের মতো। নিভৃতচারিনী এই কবির কাছে সফলতা কখনও বিষ্ময়চিহ্ন হয়ে ওঠে। তিনি লেখেন, 'সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মাঝপথে বসে পড়া/ চলবে না আর। ছাদে ওঠবার সিড়ির মাঝপথে/ যে জানলা থাকে, তার দিকে চোখ গেলেই /সরিয়ে নিতে হবে নিজেকে।' উচ্চাশা সংকুল এই প্রতীকী সিঁড়িপথ ভাঙতে ভাঙতে তিনি লেখেন, 'বাকি সিঁড়িগুলো এগিয়ে গিয়ে/ পার হয়ে নিতে পারলেই একটা ছাদ।/ কয়েকটা শ্বাস নিতে হবে।/ শ্বাস পুরো নেওয়া হবে না/ পুরো একটা শ্বাস নেওয়ার মতো অক্সিজেন /পৃথিবীতে বাড়ন্ত এখন।' তারপর অবরোহন কালে 'একসময় সিঁড়িটি অদৃশ্য হয়।/মাছরাঙাটির মতো ঝুপ করে ডুব দিতে হয়/ ছাদ থেকে ছায়ার ভিতরে।'(সাফল্য)
অন্তর্গত চৈতন্যের গহন থেকে শ্রীপর্ণার শব্দগুলি চিত্ররূপ নিয়ে থাকে। অভিনবত্বে, আঙ্গিক বৈচিত্রে নিজস্ব ক্যালাইডোস্কোপটি নড়ে উঠলে আমাদেরও চোখে ভেসে ওঠে ' ...পুরোনো চড়ুই, লালরংয়ের ফড়িং,/ পুরোনো বাড়ির গন্ধ, ধান পেটানোর শব্দ/ মুড়িভাজার গান, মুশকিল আসানের সুর।' তাঁর কবিতায় আশ্চর্য এক মাত্রা নিয়ে উঠে আসে বর্ণমালা, যেমন, 'বেলা মরে যাবে জেনে জানলায় দোল খায়/ হলদে পর্দা। রোদ মাখে গায়।/ উদ্যত কুঠার জেনে তাও, বেগুনি ফুলটির লোভে/ অচিন আগাছা জন্মায়।' তবুও ব্যাকুলতা-প্রতীক্ষা-বিরহের মধ্যেই লালিত তাঁর কবিতাগুলি যেন হয়ে ওঠে সুগন্ধি রুমালের স্মৃতিগন্ধময় মেদুরতা। তাঁর কবিতায় ফিরে ফিরে এসেছে রামগিরি পর্বতের বিরহী মেঘেরা। প্রিয়তমকে লেখা চিঠি নিয়ে অপেক্ষায় রয়েছেন পত্রদূত পায়রাটির জন্য, 'যে ভোরবেলায় এসে বসবে আমার জানলায়।/ আমি তার পায়ে বেঁধে দেব একটি চুম্বন,/ ভালোবাসার রক্তগোলাপ।'( প্রতীক্ষা )
'কোনো কোনো গাছতলা বনভোজনে ডাকে'
কবির হৃদয় বুঝি চিত্রকরের প্যালেট, কত যে রঙ সেখানে! 'হলুদ আর সবুজ রং দেখলে আমার একটা/গাছতলা আঁকতে ইচ্ছে করে। তার নীচে বিছিয়ে রয়েছে হলুদ রংয়ের একলক্ষ ফুল। নীল রং দেখলে আমার ইচ্ছে হয় নদী আঁকতে। আবার, 'আকাশ আঁকার জন্য নীল রং খুঁজে এনে দেখি/ বাবুই বুনছে বাসা সে আকাশ জুড়ে।/ বাসায় জোনাকি জ্বলে সবুজাভ নীল,/ আমার আঙুলে লাগা আকাশের রং ধুয়ে যায়/ভেসে যায় যমুনা কল্লোলে।' (চিত্রকর) অন্য এক কবিতায় তিনি কিছুটা যেন উন্মনা, 'কোথাও কেউ আমায় ছুঁয়ে আছ ...আমার মেসেঞ্জারে ছোট্ট একটা সবুজ বিন্দু হয়ে/ছুঁয়ে আছ আমাকে।দেশে ও দেশের বাইরে।/...তুমি আমায় আলগোছে বলে যাও/ একবিন্দু সবুজ হয়ে আমার বুকেই আছ।'(অনলাইন)
রক্তের রং কৃষ্ণচূড়ার মত লাল দেখেন কবি। ফুলেরা তাঁর চোখের মণি কাঁটা হয়ে বিঁধে অন্ধ করে চলে যায় তাই তিনি ফুলেদের আর ফলের বীজ নিয়ে বছর বছর ধরে মাটিতে পুঁতে দিয়ে হিরন্ময় ভালোবাসার জন্ম দিতে চান। জীবন কখনো তাঁর কাছে 'মাছের আঁশ-আঁতুড়ঘর-নুন হলুদ'। তিনি 'অশ্রুলোভী একখণ্ড অভিশপ্ত মেঘ' হয়ে থমকে দাঁড়ান আকাশ আর পৃথিবীর মাঝখানে। এজন্মের পরবাসে নিজের বুকে কান পেতে শুনতে পান, 'বাসনামন বলছে শোন/ আর একবার কি ফেরা যায়?'(জলখেলা)
'মা তাদের আমার শ্বাসে ভরে দিতে দিতে বলেছিল/চন্দন কাঠের বাক্স এখন থেকে তোর'
গ্রন্থের শেষতম কবিতা 'চন্দন কাঠের বাক্স'। যে বাক্সটি ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছেন কবি। দূর থেকে সুগন্ধ ভেসে আসতো আর ছোট্ট বাক্সে অন্তর্লীন না দেখা রহস্য সম্ভারের আভাস পেতে চাইতেন। মন কৌতুহলী হলে তখন মা বলেছিলেন, 'আকাশে বড় একটা চাঁদ উঠুক/দেখাবো তখন।' তারপর এক চাঁদনি রাতে মা তাঁকে কোলের কাছে বসিয়ে সেই বাক্সটির ডালা খুললে কবি দেখলেন 'তার ভেতরে মায়ের বিন্দু বিন্দু ঘাম বাষ্প হয়ে/জলকণা হচ্ছে আর তারপর তা বিন্দু বিন্দু হিরের/মতো ঝলমল করতে করতে রং বদলাচ্ছে/ কোনোটা হচ্ছে গোলাপি রঙের ভালোবাসা, কোনোটা লাল রঙের তেজ,/কোনোটা সবুজ রংয়ের প্রাণ,/কোনোটা নীল রংয়ের আকাশ, আর কোনোটা কান্না রঙের মেঘ।'
মায়ের কাছে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই চন্দনের কাঠের বাক্সটি হয়তো নানান বর্ণগন্ধে রূপান্তরিত হয়ে চলা তাঁরই যাপিত জীবনের প্রতীক। আকাশের মতোই মুহূর্তে রং পাল্টে যাওয়া যে জীবন রং-রূপ-স্পর্শ-গন্ধ আর আনন্দ-বিষাদে ভরা বৈচিত্রময়। সেই জাদুবাক্সটি বুঝি অলীক চন্দনের কাঠ দিয়ে তৈরি! এ যেন এক আশ্চর্য জাদুবাস্তবতা। কবিতাটি তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থটির অন্তর্লীন প্রেম-বিরহ-আবেগ-আর্তির সার্থক চালচিত্র হয়ে উঠেছে। পাঠককে পৌঁছে দিতে চেয়েছে তাঁর সেই স্বপ্নলোকে, 'যেখানে সন্ধ্যামণি ফুলে লেগে আছে/ মেঘভাঙা বিকেলের রোদ। বনের চন্দন গন্ধ।' সেই 'লালরঙা ফড়িং আর জোনাকি ধরার ছোটোবেলা।/ ছাদের আলসে জোড়া থোকা থাকা জুঁই ফুল/ জোছনার মতো সাদা,অপরূপ হাওয়া বয়ে যায়।/ চাঁদের শোভাটি দূরে কাছেই যে জল।/ মায়ের মুখের কথা মেঘ হয়ে আকাশে জমেছে...'(শৈশব)
এই গ্রন্থের অধিকাংশ কবিতায় সাতটি রঙে দিগন্তবিস্তৃত এক উজ্জ্বল রামধনু ওঠে। কখন যেন কবির আঙুলের মধ্যে থাকা এক অদৃশ্য আঙুল সরোদে মূর্ছনা তোলে, দিগন্তে ঝলমল করে ওঠে শ্রীপর্ণার কবিতার ব্যক্তিগত রামধনু, বৃষ্টিধোয়া উজ্জ্বল সব বর্ণমালা। ঠিক তখনই কবিতার মাথুর বাতাসে চন্দনের সুঘ্রাণ ভেসে আসে। সূর্য বা চন্দ্রের অস্তাচলে যাওয়ার পথেই মুহূর্তে যেন তাঁর সেই তরল হৃদয় পাথরে রূপান্তরিত হয়। সেই স্থবিরতাটুকুও পাঠককে বিষাদে মুড়ে দেয়, সর্বস্বান্ত করে। অরূপের রূপটি স্বচ্ছতোয়া ঝর্ণায় প্রতিবিম্বিত হয়ে কবির বিরহাতুর হৃদয়ে পশ্চিম দিগন্তে অন্তর্লীন হতে থাকে। অনায়াস মুন্সিয়ানায় কলমের এক একটি আঁচড়ে শ্রীপর্ণা নানা রঙের বাসনা দিয়ে নৌকা তৈরি করে একে একে অবলীলায় ভাসিয়ে দিতে থাকেন। আকাশগঙ্গার ঢেউ নিশ্চয়ই একদিন তাদের পৌঁছে দেবে অভীষ্টে, অমরাবতীর আরাধ্য ঘাটে।
আত্মকথনের ভঙ্গিমায় নিজেকে জলজ মুকুরে ঝুঁকে দেখার মতোই তাঁর কবিতাগুলি প্রতিবিম্বিত। রহস্যলীন কারুকার্যের বুননে নির্মিত প্যাটার্নটি জেগে থাকে তাঁর কবিতার পরতে পরতে। সঙ্গোপনে রাখা টলটলে এক বিষাদময়তা শ্রীপর্ণার কবিতাকে এভাবেই অলৌকিক ও সংকেতময় করে তুলেছে।পাঠশেষে ভালোলাগাটুকু ঝলমল করতে থাকে। প্রথম কাব্যগ্রন্থে সংকলিত এই ছেষট্টিটি কবিতাকে কবির ছায়াপথে হেঁটে যাওয়ার সূচনাপর্ব হিসেবে ধরে নিলে এই তন্বী গ্রন্থটি হয়তো পাঠক প্রত্যাশার সংশয়ী আকাশে ধ্রুবতারা হয়ে ফুটে উঠবে। সেই নভোমণ্ডলও যেন প্রতীক্ষায় রয়েছে নবীন এক গ্রহজন্মের। শ্রীপর্ণার নিজস্বতার বর্ণচ্ছটায় কবিতার মেঘলা আকাশ ঝলমলে আলোয় ভরে উঠেছে,স্বপ্ন দেখি!
..................................................................
চন্দন কাঠের বাক্স ■ শ্রীপর্ণা গঙ্গোপাধ্যায় ■ ঋত প্রকাশন ■ ১০০ টাকা

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন