বামপন্থাই পথ
বিগত রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে এ-রাজ্যের বামপন্থার ভবিষ্যৎ খুবই চর্চিত বিষয়। যে সমস্ত কলমচিগন বামপন্থার নিকেশ কামনা করতেন তাঁরাও বামপন্থার ভবিষৎ নিয়ে ভাবিত। আসলে এমনও হতে পারে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক প্রভাত পট্টানায়েকের সেই বিখ্যাত উক্তি- "প্রশ্নটা বামপন্থার কোন ভবিষ্যৎ আছে কি নেই, প্রশ্নটা হল বামপন্থীদের ছাড়া এদেশের কোন ভবিষ্যৎ আছে কি নেই ", এই উক্তি বাম-আদর্শ বিরোধী বুদ্ধিজীবী মানুষকেও প্রভাবিত করেছে ।
আসলে বামপন্থীদের এই ফলাফলের পর অর্থাৎ শূন্য হবার পর কেউ হতোদ্যম, কেউ উল্লসিত। এটা বাস্তব সত্য যে, ১৯৪৬ সাল থেকে এই প্রথম বিধানসভায় বামপন্থীদের কোন প্রতিনিধিত্ব নেই। ফলে কেউ কেউ বেশি হতাশ। নেতৃত্বের রণকৌশল, আই.এস.এফের সাথে জোট এসব প্রশ্নও সামনে আসছে। এবিষয়ে বামপন্থী পার্টিগুলো তাদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক পর্যালোচনা করে তার রিপোর্ট জন সমক্ষে আনবেন সেটা এখানে আলোচনার প্রতিপাদ্য বিষয় নয়।
তবে এটা ঠিক সংসদীয় রাজনীতিতে আসন সংখ্যা ও শতকরা ভোটের হিসাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বামপন্থীদের কেবল ভোটের হিসাব করার কথা নয়। তার আদর্শ সে কতটা অনুসরণ করতে পারছে, বাস্তবতা অনুযায়ী সেই আদর্শ পরিমার্জন করা দরকার কিনা- এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মধ্যে পড়ে।
যদিও পশ্চিমবঙ্গে এই ফলাফলের ভিত্তিতে সারা ভারতে বামপন্থীরা বিপর্যস্ত একথা বলা যাচ্ছে না, কারন একই দিনে ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে কেরালার সাধারণ ট্র্যাডিশন ভেঙে সেখানে বামপন্থী ফ্রন্ট সরকার প্রত্যাবর্তন করেছে। কয়েক মাস আগে বিহারের নির্বাচনে বামপন্থীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করেছে। বরং পশ্চিম বাংলায় বলা যায় ধর্মবাদের সুনামির কাছে শ্রেণী-রাজনীতি সাময়িক ভাবে পরাজিত হয়েছে। এই নির্বাচনে বামপন্থীদের তরুণ প্রজন্মের প্রার্থী ছিলো এবং তরুণ প্রজন্ম নিরলস ভাবে কাজও করেছেন এটা ঠিক। কিন্তু তরুণ মুখের সাথে ভাবনায় তারুণ্যের কোন ঘাটতি ছিলো কিনা খুঁজে দেখা দরকার। যদি ঘাটতি থেকে থাকে তাহলে তরুণ মুখ পুরাতন ভাবনা বহন করেছেন যা বর্তমান প্রজন্মের তরুণ ভোটাররা গ্ৰহণ করতে পারেন নি।
বামপন্থীদের হাত খালি এটা ঠিক, কিন্তু শূন্য অসীম সম্ভাবনার আধা। এ-সময় চার্লস ডিকেন্সের ‘এ টেল অব টু সিটিজ’ এর বিখ্যাত লাইন বামপন্থীদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ- "এটাই সব থেকে ভালো সময়, এটাই সব থেকে খারাপ সময়"। নিজেদের গড়ার উপযুক্ত সময় এটা, ঔদ্ধত্যের অবশিষ্ট অংশটুকু ছুঁড়ে ফেলে বাঁধা ছকের বাইরে আসার সময় এটা। ডঃ অর্মত্য সেন সাধারণ মানুষ হিসেবে বামপন্থীদের কাছে দাবি করেছেন- "চিন্তাশক্তি আর একটু ব্যবহার করুন, কার্পণ্য নয়, ঔদার্য"। এগুলো মাথায় রেখেই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রচিত হোক।
বিশ্বপুঁজির মুনাফার হার যত কমছে, ততই সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকার উপর আক্রমণ বাড়ছে। সাধারণ মানুষের পকেটে থাবা মেরে নিজেদের আখের গোছানোর উদগ্ৰ বাসনা অনুযায়ী কাজ করছে বহুজাতিকরা, দেশ ও এই রাজ্য সরকার তাদের সহযোগী ভূমিকা পালন করছে ও করবে। অন্যদিকে বামপন্থা আসলে বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার মতবাদ, যদিও আমাদের দেশে তার বহুমুখী একটা মুখের দ্বন্দ্বও আছে। কিন্তু মূলগত ভাবে বামপন্থা মানে আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের বিরোধিতা করা, সাধারণ মানুষের গনতন্ত্রের দাবি প্রতিষ্ঠা করা। শুধু স্লোগান নয় লড়াইয়ের ময়দানে বামপন্থার প্রকৃত ভবিষ্যত নিহত আছে। তাই খুব প্রয়োজন মানুষের সংগ্ৰামী জোট।
ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত

নিঃসন্দেহে বামপন্থার ভবিষ্যৎ আছে। কিন্তু বর্তমান বামপন্থী নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখীন।
উত্তরমুছুন