রাসোমন : ফিল্ম রিভিউ
মিথ্যার বা সত্যির অপূর্ব মনস্তত্ব
ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় ,মানুষ মিথ্যে কথা বলা বেশিদিন শেখেনি। খুব বেশি হলে সাত আট হাজার বছর। তার আগে মানুষ জানতোই না কিভাবে মিথ্যে বলতে হয়। জানতো ই না কেন মিথ্যে কথা বলতে হবে!
তো মানুষ সভ্যতার ক্রম বিকাশের সাথে সাথে মিথ্যে কথা বলতে শিখলো। অর্থাৎ
কিনা কোনো ঘটনা যা সে ঘটতে দেখেছে তাকে হুবহু উদ্ধৃত বা বর্ণিত করার বদলে তাকে একটু
বা সর্বতো ভাবে পাল্টে উপস্থিত করতে শিখল। কিন্তু পাল্টাতে গেলে বা সোজা কথায় বানিয়ে
বলতে গেলে তার একটু কল্পনা প্রবন হওয়ার প্রয়োজন পড়ে। প্রয়োজন পড়ে ঘটনা টি কে পুননির্মানের
। এবং এই পুনঃ নির্মিত ঘটনা টিকে উপস্থাপন করার আগে তাকে নিজের মনে বার বার আউড়ে অনুশীলন
ও করতে হয়।
এখন, তার এই পুনঃনির্মাণ কৌশল টি তার মনস্তত্ব দ্বারা নির্ধারিত হয়।
আর মনস্তত্ব বা তার মনের গঠন ভীষণ ভাবে সমাজনির্ভর হয়।
তাহলে সূত্র গুলো দাঁড়ালো এইরকম।
সমাজ এর দ্বারা একজনের মনের
গঠন নির্ধারিত হয়। মনের গঠনের ওপর নির্ভর করে মিথ্যার ধরণ।
এবং মিথ্যার উদ্দেশ্য ও সমাজ। অর্থাৎ সমাজে র কাছে নিজের ভাবমূর্তি
আমি ঠিক কি রাখতে চাইছি তার ওপরেই নির্ভর করবে আমি ঠিক কি মিথ্যে বলব!
আমি যদি নিজের ইনোসেন্ট ভাবমূর্তি বজায় রাখতে চাই তো বলব ' কিছুই করিনি
আমি'!
যদি হিরো বা নেতা হতে চাই ,'সব তো আমি ই করলাম'! যদি ভিকটিম ইমেজ চাই,
"আমার এই টা করা ছাড়া অন্য উপায় ছিল না!"
এখন যা বলছিলাম। মিথ্যে বলা খুব একটা সহজ নয়। অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে তবে
ঘটনার পুনঃনির্মাণ করা যায়। তাই মানুষ কিছু চট জলদি কৌশল আবিষ্কার করল।
১. প্রতিফলন :
এক্ষেত্রে পুরো ঘটনার পুনঃনির্মাণ খুব সহজ হয়ে যায়। আমি শুধু ঘটনা টি
ঠিক উল্টে দেব।
যেমন : আমি আগে ধাক্কা দিয়ে বলবো ও আগে আমাকে ধাক্কা দিয়েছে। স্থান
কাল মোটামুটি একই রেখে দেব।
২. প্রতিস্থাপন:
এক্ষেত্রে ও পুরো ঘটনা টিকে পুনঃনির্মাণ না করে, শুধু অন্য এক চরিত্র
এর সাথে নিজেকে পাল্টে নেব।
যেমন : আমার কোনো সঙ্গী কোনো সাহসিকতার কাজ করলো, আমি ঐ কাজ,স্থান সময়
অক্ষুন্ন রেখে বন্ধুর জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেব।
কিংবা আমি নিজে কে নির্দোষ দাবি করতে আমার করা কোনো খারাপ কাজ আমার
কোনো সঙ্গীর নামে চাপাবো, ঘটনা স্থান সময় অক্ষুন্ন রেখে।
৩. অতিরঞ্জন:
আমি ঘটনা টিকে হুবহু উপস্থাপিত করে আরো কিছু জুড়ে দেব। যাকে অতিরঞ্জন
বলে। তিন জনের সাথে লড়ে এসে বলব পাঁচ জনের সাথে লড়েছি।
৪. অবদমন:
ঘটনা টি প্রায় পুরো টি বলবো। তবে ঠিক পুরোপুররি না। কিছু টা চেপে যাবো।
এখন আমি এইসবই করব কিছু না কিছু কারণে। যেমন আত্মরক্ষা,অর্থ লাভ, ইত্যাদি।
এরকমই একটি কারণ হল সমাজে নিজের পছন্দ মত ইমেজ তৈরি করা, বা ইমেজ বজায় রাখা।
কিছু লোকের, ইনফ্যাক্ট অনেকের ধারণা মানুষ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে মিথ্যে
কথা বলে না। ভুল। সর্বৈব ভুল। আজকের সভ্য মানুষ এতটাই সামাজিক যে তার মৃত্যু পরবর্তী
ইমেজ নিয়ে ও চিন্তিত থাকে! সমাজ তার কি মূল্যায়ন করবে এই চিন্তা , এই মোটিভ তাকে মৃত্যুর
আগেও মিথ্যা বলতে প্ররোচিত করে।
"Rashomon " আকিরা কুরসওয়ার একদম প্রথম দিকের বানানো ছবি।
যা জাপানি সিনেমা কে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি দেয়।
ছবিটি রায়ানসুকে আক্তাগাওয়ার লেখা একটি লেখা একটি গল্প অনুসারে বানানো। একটি খুন এবং একটি ধর্ষণের ঘটনার বিচার চলাকালীন
বাদী বিবাদী এবং সাক্ষীর বয়ানের ভিত্তিতে ঘটনাটির পুনঃনির্মাণ এর চেষ্টা করা হয়। এবং
তখনই বোঝা যায় প্রত্যেক ব্যাক্তিই সত্য বলতে নিজের দার্শনিক-বুদ্ধি দ্বারা নির্ণীত
সত্যকেই 'প্রকৃত সত্য' বলে দাবী করেছেন। যদিও ছবিতে শেষে কাঠুরের বয়ান নিরপেক্ষ সত্য
বলে মনে হয় , কিন্তু এটি আসলে কাঠুরের দার্শনিক-বুদ্ধি দ্বারা নির্ণীত সত্য।
ছবিতে লেন্সকে অনেকবার সূর্যের সরাসরি বিপরীতে ধরা হয়েছে। সূর্যকে ধ্রুব-সত্য রূপকে কল্পনা করে গোটা ছবিতে আলো-ছায়া র ব্যবহার চমৎকার। 'পথের পাঁচালী' কে মনে করায়।
ডিটেইলিং দুর্দান্ত। সামুরাই এর সাথে দস্যুর সোর্ড ফাইট এর মাত্রা আর সময়ও পাল্টে যায় বিভিন্ন জনের বয়ানে। পাল্টে যায় মেক-আপ ও। আজ থেকে সত্তর বছর আগে বানানো ছবির ক্ষেত্রে এতটা ডিটেইলিং প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে যায়।
ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত

অসাধারণ পর্যালোচনা লেখককে অভিনন্দন।
উত্তরমুছুন