কবিতাঃ বিভাস সাহা




 নীলা

বছরের প্রথম কালবৈশাখী মানে যতিন বাগদির হিসেব নিকেশ – ঘরের চালে কোথায় কতটা খড় দেওয়া দরকার। আমরা ছোটদের শেখাতাম শিলাবৃষ্টির শিলা না ধুয়ে খেতে নেই। আর মা-পাখি ঘুমন্ত সন্তানের চোখের উপর থেকে ডানার চাদর সরিয়ে বলত, ‘উঠে পড়ো, আজ তোমার প্রথম উড়ান’।

সেসব অবাধ্য ধুলো ঝড় শেষ হলে সন্ধে হতো শীতল। আমরা বরেন স্যারের ঘর থেকে টিউশানি পড়ে ফেরার পথে দেখতাম কামিনী গাছের গোড়ায় শুয়ে আছে দু চারটে নির্বিষ সাপ। আর পাতার আঁচল থেকে চুঁইয়ে পড়ছে জামদানির মতো জোছনা।এমনই এক রাতে সুবল মিত্তিরের বোন নীলা ঘর ছেড়েছিল, ওই বরেন স্যারের সাথে।

সেদিন ঘুমের মধ্যে নীলার হাত ধরতে চেয়েছিলাম। সেদিন নাগচম্পার গন্ধে মেঘ ভেসে এসেছিল, সেদিন কিভাবে যেন বয়স বড় হয়েছিল, আপনি আপনিই ।

আমাদের কাছে অঙ্ক মানেই ছিল বরেন স্যার। অথচ তার বাড়িতে অঙ্কের বই ছিল না, ছিল সারি সারি কবিতার বই। তার মুখে শুনেছিলাম কোন এক বিখ্যাত কবির এই দুটি লাইন –

        “ বাড়িটি থাকবে নদীর কিনারে, চৌকো

          থাকবে শ্যাওলা রাঙানো একটি নৌকো,…”

লজ্জা ঘেন্না জনশ্রুতি ইত্যাদির ঘোলা জল থিতু হলে একদিন ধরা পড়ল অবৈধ দম্পতি। জলের ধারে নৌকো লাগানো একটা চৌকো বাড়ির বারান্দায় পুলিশ এসে যখন দরজা ধাক্কা দিল, তখন বাবার বয়সী বরেন বসুর বুকে মাথা রেখে নীলা মিত্র শিশুর মত ঘুমিয়ে। তার হিরের নাকছাবিটি ছিল শুকতারার মত একাকী এবং উজ্জ্বল।

ওদের যখন পাড়ায় আনা হলো, তখন বরেন স্যারের কোমরে দড়ি বাঁধা, আর নীলা যেন অবাধ্য চিতা। দাদার মুখের উপরে ছিটিয়ে দিল একদলা থুতু। ‘ওর কোন দোষ নেই, সব দোষ আমার। মারতে হলে আমাকে মারো‘, এই বলে নীলা মায়ের মত আগলে রাখলো বরেন স্যারকে ।

লম্পট মাস্টারকে শিক্ষা দেওয়ার জন্যে চড় থাপ্পড় মারা হলো। কেউ খেয়াল করেনি সবার অলক্ষ্যে বরেন স্যার আগেই বিষপান করেছিল। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগে সে বিষময় ঠোঁটে তার শিশুপুত্রের কপালে চুম্বন দিয়েছিল, আর বিড়বিড় করে বৌকে যা বলেছিল তা বোধহয় একটি অসমাপ্ত ক্ষমাপ্রার্থনা।

নীলাকে তুলে দেওয়া হয় ক্লাবের ছেলেদের হাতে। নাটমন্দিরের পিছনে ভোগ রান্নার ভাঙা ঘরটিতে নরখাদকদের পিকনিক শেষ হলে সাতটি নারী জন্ম অতিক্রম করে নীলা যখন এসে দাঁড়ালো, তখন সে সম্পূর্ণ উলঙ্গ।  তার হাঁটবার ক্ষমতা নেই। তার দাদাই মারে বাঁশের প্রথম ঘা-টি। অবশিষ্ট থুতু ও জেদ সব রক্ত হয়ে ঝরে পড়েছিল, ঐ নাটমন্দিরের সামনে -- যেখানে নীলা, আমি আরো অনেকে খেলতে খেলতে বড় হয়েছিলাম।

সেদিন বিকেলে বৃষ্টি নেমেছিল খুব, ঝড় ছাড়াই।


ছবিঃ অনুষ্টুপ লাই

1 টি মন্তব্য:

  একটি   লড়াকু   পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল, চিরঞ্...