প্রবন্ধঃ অচিন্ত্য মাজি

  



সত্যের মুক্তি মুক্তির সত্য

মনে হয় সারাদিনের ক্লান্তি শ্রম আর ঘাম ঝরানোর তুমুল কোলাহল ছাড়িয়ে একটি সুনিশ্চিত আলোর আশ্রয়ে ছুটে চলা। এই চলাতো সেই সত্যের উৎসে যেখানে পবিত্র এক উত্থান নিশুতির মতো নিবিড়তা নিয়ে স্নিগ্ধ হয়ে আছে। আসলে সত্যের কোনো রঙ হয় না, সত্যের কোনো দাগ নেই, সত্য জানে শুধু মানুষেরই বুক। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের হীনতা আর বেঁচে থাকার কুশ্রী ভঙ্গীর মধ্যে প্রকৃত সত্যকে ছোঁয়ার কোনো আয়োজনই থাকে না। সত্য আসলে তড়িতের শক্তিময় আধার যার তাপে নেতিয়ে পড়ে আমাদের সমস্ত ভ্রান্তি আর অভিনয়ের। যাপনের প্রতিটি পদক্ষেপকে আরো চেকনাই আরো পালিশ করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে আমাদের, সেই চতুর মসৃণতায় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে সত্যের সহজ লাবণ্য। লোকলোচনের লোভী চাউনি ক্ষত বিক্ষত করে দিচ্ছে বিশ্বাসের গোপন তর্জনিকে। বিপন্ন মানুষের অজস্র দোলাচলকে প্রত্যক্ষ করেছেন শঙ্খ ঘোষ। কবিকে আজ দখল করে নিয়েছে মানুষ। তিনি আর নতজানু, নীরব নিঃশব্দ নন। ভীড় আর কলরবের মাঝ থেকে তিনি প্রসব করেন কবিতা। ব্যবসায়িক লেনদেনের এই পৃথিবীতে হৃদয়ের চাইতে হিসাবের কারবার অনেক বেশি তীব্র। গণ্ডীবদ্ধ এই কর্পোরেট দুনিয়ায় মানুষ নিজের কাছ থেকে নিজেকেই প্রত্যাহার করে নিয়েছে। বড় বেশি কলরব মুখর এই সময়। সকাল থেকে রাত্রি অব্দি মানুষের জীবন রুটিনমাফিক। এর বাইরে পা বাড়ানোর জোনেই মানুষের। মানুষ হয়েউঠছে স্বার্থসর্বস্ব সুবিধাবাদী ভোগপ্রবণ। সকলেই আত্মরতির ঘূর্ণিঝড়ে প্রবল ভাবে পাক খাচ্ছে। গ্রাম, মফস্বল, শহর, নগর প্রতিটি জায়গাতেই মানুষের মুখ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে লৌকিক স্বর। গ্রামকে দখল করছে শহর, শহরের শিকড় উপড়ে নিচ্ছে মেট্রোপলিটন বোধ। বিজ্ঞান আর বিজ্ঞাপন সারা পৃথিবীর মূল্যবোধকে কব্জা করতে নেমেছে। নিজেদের কার্যসিদ্ধি ঘটানোর জন্য মানুষের ভাঁড়, ভণ্ড বা বকধার্মিক হতে বাধা নেই- কে কাকে ঠিক কেমন দেখে/ বুঝতে পারা শক্ত খুবই/ হারে আমার বাড়িয়ে বলা/ হারে আমার জন্মভূমি (মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে)। প্রতিটি মানুষ তার দুটি সত্বা নিয়ে বেঁচে থাকে। বাইরে বাইরে সে ভালোমানুষ, সৎ, নম্র আর ভেতরে ভেতরে শান দিয়ে চলেছে ধারালো ছুরি। কূট অভিনয়ের চমক ফুরালেই বেরিয়ে পড়বে সাদা শ্রীহীন বীভৎসতা। কবির অনুভূতি ধাক্কা খায় সহজ সত্যকে পেতে গিয়ে – বিকিয়ে গেছে চোখের চাওয়া/ তোমার সঙ্গে ওতপ্রোত/ নিওন আলোয় পণ্য হলো যা কিছু আজ ব্যক্তিগত’। সাম্প্রতিক মানুষ মিডিয়ার গ্রাসে হত চেতন। বিজ্ঞাপনের বাচাল আওয়াজ ভাসিয়ে দিচ্ছে প্রতিটি সত্য ও সততাকে। চারপাশের এই অজস্র কোলাহল আর আত্মলোলুপতা সংবেদনশীল কবিকে উতলা করে। এই জৌলুষ আর চমকে কবিরা ভুলে যান তাদের অঙ্গীকার আর বিশ্বাসের সত্যকে। নিজেকে প্রকাশ করার ব্যাকুলতা, রঙের পৃথিবীতে নিজেদের রঙিন করার নেশা পেয়েবসেকবিদের। প্রকৃতকবিএইচাতুর্য ও সম্মোহন থেকে অনেক দূরে – ঘরে ফিরে মনে হয় বড়ো বেশি কথা বলা হল? /চতুরতা, ক্লান্ত লাগে খুব?/ মনে হয় পিশাচ পোষাক খুলে পরে নিই/ মানব শরীর একবার?/ দ্রাবিত সময় ঘরে বয়ে আনে জলীয়তা, তার/ভেসে ওঠা ভেলাজুড়ে অনন্ত শয়ন লাগে ভালো/ যদি তাই লাগে তবে ফিরে এসো। চতুরতা যাও। লোকে বলবে মূর্খ বড়ো, লোকে বলবে সামাজিক নয়। দিন শেষের বৈকালি আলোয় পৃথিবীকে যখন মায়াবী বলে মনে হয়, যখন খুব বেশি কথার ঘোরে আচ্ছন্ন হয় হৃদয় যখন অন্ধকারের শান্তির আভা ঘুলিয়ে ওঠে হুজুগের তাপে তখন এই গর্জন থেকে কবি মুখ লুকাতে চান। এত বেশি কথার তুফানে নিবেদনের পবিত্র শিখা জ্বলে উঠতে পারে না, আহত হয় তার সহজ সৃজন – আমি বলতে চাই, নিপাত যাও/এখনই/বলতে চাই, চুপ/তবু/ বলতে পারি না। আর তাই/নিজেকে ছিঁড়ে ফেলি দিনের পর দিন’ আত্ম তার কাছে যাওয়ার এই গভীর আকুলতা লোকলোচনের নজরে অসামাজিক বলে বিবেচিত হয়। স্রোতে গা ভাসানোই সাধারণের ধর্ম, কবির নয়। তাই অজস্র মানুষের ভীড়ে তিনি একা হয়ে যান, চতুর হৈ-হট্টগোল থেকে সযত্নে বাঁচাতে চান সত্তাকে। তবুও বিষম সহাবস্থানে জেগে ওঠে ওঠে হঠকারিতা আর মজ্জার ভেতরে সৃষ্টি হয় তোলপাড়। তাই দরকার আরো শুদ্ধতার, চাই আরো ধ্যান, প্রসন্ন দৃষ্টি। জীবনের বিক্ষুব্ধ বারোমাস্যা থেকেই শোষণ করে নিতে হবে সেই অবিচল মৌনতা। কঠিন শূন্যতা, শীতলতা বুকের ওপর দাঁড়াবে নিশ্চুপ নেত্রে, অসুস্থ ঘুমঘোর আর অসার তাকে ঝাঁকুনি দিয়ে চিত্তের ভেতরে সৃষ্টি হবে নির্বাণের আভা। প্রকৃত নীরবতা আর শূন্যতার ভেতর স্তব্ধতার যে জমাটস্তর তার ভেতরই আছে মানবের সত্যভাষ্য- মুহুর্ত মুহুর্ত শুধু জন্মহীন মহাশূন্যে ঘোরা/ কার পূজেছিল এতদিন? একা হও একা হও একা হও একা হও/ আজ খুব নিচু করে বলি, তুই নেমে যা নেমে যা/ পাথর, দেবতা ভেবে বুকে তুলেছিলাম এখন/ আমি তোর সব কথা জানি! প্রেমে আত্মসমর্পণ আহত হলে অহংতীব্র হয়ে ওঠে। চিৎকারের বিরুদ্ধে চিৎকার নয় চুপ করে থাকাটাই হবে প্রকৃত কবির শ্রেয়ো বোধ। বাস্তবের ভেতরকার আর্তনাদে মগ্ন চৈতন্য মাথা মেলবে তবে তা প্রত্যাঘাতের ভঙ্গিমায় নয়, তার চরিত্র হবে রুঢ় রৌদ্ররেখা থেকে দূরে মেধা ও বিদ্রোহের উজ্জ্বলতায় ঋদ্ধ। খুব নতজানু থেকে কবি বর্তমান্রে বিদ্রোহহীন বন্ধ্যা জীবনবোধকে আঘাত করেছেন। আসলে যা কিছু অমানবিকতাকে ভাঙাই সত্যের ধর্ম। জীবনকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েই কবি আহরণ করেন প্রাণরস। কবির ওকাজ সমস্ত অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রত্যাঘাত, প্রতিষ্ঠানের শক্ত আগ্রাসনকে কুঠার মারা। কিন্তু সেই আঘাত হবে নিবেদনরই নামান্তর। অর্থাৎ আত্ম ও আত্মতার পুঞ্জপুঞ্জ প্রাকশে জন্ম নেবে আক্রোশহীন আগুনহীন গভীর অস্তিত্বময় এক ভাষা। এই ভাষাই আত্মদানের ভাষা, বিদ্বেষেরবিরুদ্ধে, বিরোধীতার বিরুদ্ধে নীরবতার সমর্পণ। কবিকে তাই জেনে নিতে হয় সকলের কথা। সাধারণের মগজ থেকে সস্তা জীবনের যে আঁশটে ঘ্রাণ মুখরিত হয়ে ওঠে, পয়সা দিয়ে আরাম কেনার লাগসই ধামাকাগুলি যেভাবে কৌমের চোখ ঝলসে দেয় সেই আত্মধ্বস থেকে ব্যক্তিত্বকে রক্ষাকরাই তো প্রকৃত বিবেকের দায়। কবি দায়কে লালন করেন। কণ্ঠে ধরেন দ্রোহ। পরিপার্শ্বের গহন ও দাহে, উদ্যত রক্তপাতের সুলুক সন্ধান করেই কবিরও একটি একান্ত উদঘাটন ঘটে যায়।

ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত


1 টি মন্তব্য:

  একটি   লড়াকু   পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল, চিরঞ্...