প্রবন্ধঃ পার্থজিৎ চন্দ

 




বিরোধাভাসের ক্রমঃবিলয় – ‘সাতটি তারার তিমির’

 

দ্বিতীয় অংশ

    উপনিবেশের পত্তন ও সে-ঘটনাকে ঘিরে ঘটে চলা ইতিহাস প্রবাহের দিকে জীবনানন্দের স্বভাবিক এক ঝোঁক ও কৌতুহল ছিল। সে পথ বেয়েই তাঁর কবিতায় এলো নরমুণ্ডের ছবি গির্জা তুচ্ছ না-হলেও মুখ্য হয়ে উঠল নরমুণ্ড কারণ এ-পথেই বাণিজ্য এসেছেআমাদের জানা

    জীবনানন্দের কবিতায় এত যে প্রাচীন বন্দরের নাম ঘুরেফিরে আসে তার প্রধাণ কারণ তিনি উপনিবেশ স্থাপিত হবার ধারাটিকে বুঝতে চেয়েছেন আজীবন ‘নিরঙ্কুশ’ সেই কবিতাই

    মালয় সমুদ্র পারে শ্বেতাঙ্গিনীদের বন্দর যে বাণিজ্যবসতির শুরুয়াত ঘোষণা করেসেখানে উঠে আসে শ্বেতাঙ্গ দম্পতির সানবাথ এই কালচারাল শিফটের দিকে তাকিয়ে সহসা মলয়ালীর ভয় পেয়ে ওঠা যতটা না ব্যক্তিরতার থেকে অনেক বেশি দুটি সংস্কৃতির

    ‘রক্তিম গির্জার মুণ্ড দেখা যায় সবুজের ফাঁকে’, কবি গির্জার গথিক প্যাটার্নের দিকে নির্দেশ করলেন কিন্তু আমাদের কাছে উঠে এল বাণিজ্য বিস্তারের সঙ্গে মিশিয়ে দেখা ধর্ম অর্থনীতি সংস্কৃতির সংঘাত ও ব্যক্তি মানুষের ‘ফিয়ার’-এ আক্রান্ত হবার ছবি মলয়ালীর ভয় আসলে যে-কোনও আধুনিক মানুষের ভয় এই ভয়ের উৎস অনেক সময়েই তার অজানা সব থেকে বড় কথাএই ভয়ের কার্য-কারণের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সংযোগও থাকে না বেশির ভাগ সময়ে

    এই কাব্যগ্রন্থের আরেকটি বিখ্যাত কবিতা ‘সমারূঢ় এক সংবেদনশীল মনএক ক্ষতবিক্ষত জীবন কী পরিমান আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে এ-ভাবে ফেটে পড়তে পারে তার সার্থক উদাহরণ ‘সমারূঢ় কিন্তু এই কবিতার পরাপাঠের গুরুত্ব সেখানে নয় এই কবিতার পরাপাঠ আমাদের জানিয়ে দেবে নিজে ব্যক্তিগতস্তরে কবিতার শরীরে নির্মম কাটাছেঁড়া করতে পছন্দ করতেন কিন্তু উদ্দেশ্যমূলক নিন্দাবাদ তাঁকেও টলিয়ে দিয়েছিল, অস্থির করে তুলেছিল

    ‘গোধূলিসন্ধির নৃত্য’ এমনই এক কবিতা যার বেশ কয়েকটি পরাপাঠ গড়ে উঠতে পারে জীবনানন্দের অতি-প্রিয় হেমন্তকাল ও সন্ধের অনুসঙ্গে শুরু হওয়া এই কবিতাটির মধ্যে প্রথম থেকেই সংলগ্ন হয়ে থাকে এক রিক্ততামাখাদূর্জ্ঞেয়রহস্যমাখা চিত্রপট নৃমুণ্ডের আবছায়া প্রথমবার দেখা যায় এগারোতম লাইনে এসে যে নারীরা পৃথিবীর শেষে সেই দরদালানের কাছে মেতে উঠেছে এক অজ্ঞাত ‘খেলায়’ সে নারীরা আসলে ঈশ্বরীর মতো। এবং তাদের খোঁপার ভিতর নরকের নবজাত মেঘ।

    এই অংশের মধ্যে ঘনিয়ে ওঠা জগতটি বদলে যায় পরের স্তবকে এসে। সেখানে কামানের স্থবির গর্জনে সাংহাই-পতন টের পাওয়া যায়। এখানেও থিতু থাকেন না কবি। তিনি আবার একটি অকল্পনীয় উল্লম্ফন ঘটান ভিতরে ভিতরে। মেধাবিনী সেই সব নারীদের কথা উল্লেখ করেই তিনি জানিয়ে দেন, ‘দেশ আর বিদেশের পুরুষেরা/ যুদ্ধ আর বাণিজ্যের রক্তে আর উঠিবে না মেতে।’ সভ্যতার ভিতর বাণিজ্য ও আগ্রাসণকেন্দ্রিক বিপর্যয় বারবার ঘনিয়ে উঠতে দেখেছিলেন কবি। এই অংশে এসে মনে হয়, সব রক্তপাত ও যুদ্ধজয়ের শেষে পুরুষের সমর্পণ অনিবার্য। এখানে ‘পুরুষ’ শব্দটি লিঙ্গবাচক নয়; সেটি অনেক বেশি প্রবণতাকে সূচিত করছে। জীবনানন্দ লিখেছেন, ‘প্রগাঢ় চুম্বন ক্রমে টানিতেছে তাহাদের।’ বিরোধাভাস, যা অনেকের মতে তাঁর সব থেকে বড় লক্ষণ, এখানেও কাজ করেছে। এই পঙতিটির পরেই তিনি লিখতে পারেন, ‘তুলোর বালিশে মাথা রেখে আর মানবীয় ঘুমে/ স্বাদ নেই;’। অথচ সেই সব পুরুষের সমর্পণ নিশ্চিত ভাবেই এক ঘুম-পৃথিবীর দিকে তাদের ঢলে পড়াকে চিহ্নিত করেছে। মানবীয় ঘুমে নয়; সেই ঘুমকে ছাপিয়ে উঠে এক চিরঘুমের দিকে চলে যেতে চেয়েছে তারা। মানবীয় ঘুমের প্রতি বিতৃষ্ণা তাদের ঠেলে দিয়েছে এক অন্যতর ঘুমের দিকে। এই পথ ধরেই নরকের নবজাত মেঘ হয়ে উঠেছে ‘নরকের নির্বচন মেঘ।’ সেই সব নারীদের পায়ের নিচের ‘হঙকঙের তৃণের’ বদলে দেখা দিয়েছে বৃশ্চিক কর্কট তুলা মীন।এই বিস্ফার কবিতাটিকে উল্লম্ব প্রসারণ দিয়েছে। যুদ্ধ আর বাণিজ্যের ‘বেলোয়ারি রৌদ্রের দিন’ শেষ হবার পর এক বৃহত্তর বিস্তৃততর জগতের দরজা খুলে যাবে, সেই খোলা-অংশ দিয়ে যে সৃষ্টি রহস্যের অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যাবে, সে দিকে নির্দেশ করেছেন কবি।

    আর এ সবের ওপর স্থির হয়ে ভেসে থাকবে এক নারীপ্রতিমা। সেই নারীপ্রতিমার রূপ, জীবনানন্দের তুলে ধরা পৃথিবীতে, বেশ অস্বস্তিকর। প্রচলিত যৌনপ্রতিমা ও নারীর চিত্র আঁকতে চাননি তিনি। তাঁর কবিতার সঙ্গে দিনের পর দিন থাকতে থাকতে মনে হয়, এক প্যাগান কল্প-নারীর দিকে তাকিয়ে রয়েছেন তিনি। ইউরোপের উইচ-কাল্টের সঙ্গে এই নারীদের এক মৌলিক পার্থক্য আছে জীবনানন্দের এই কবিতা-সহ আরও বহু কবিতার নারীরা রহস্যময়তারা খোঁপার ভিতর নরকের মেঘ ধারণ করতে পারেকিন্তু তার সবাই আত্মলীলায় মগ্ন পুরুষ সহ সৃষ্টির অপরাপর অংশ তাদের কাছে গৌণ এই মহা-রহস্যময় ও অ-স্থিত নারীপ্রতিমার দিকে ঝুঁকে পড়েছেন কবি বারবার 

    এই অ-স্থিত নারীপ্রতিমার কল্পচিত্রটিকে অনেকেই সর্বনাশা নারীর চিত্রায়ণ ভেবে ভুল করেছেন কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়তারা সর্বনাশা নয় তারা আসলে আমাদের প্রাত্যহিকতা থেকে দূরে অবস্থান করা এক দূর্জ্ঞেয় অস্তিত্ত্ব

    ‘সাতটি তারার তিমির’ জীবনানন্দের আত্মপ্রশ্নের এক দীর্ঘ ধারাপাত তথ্যের আনুভুমিক বিস্তারের প্রতি এক সময়ে তাঁর যে ঝোঁক দেখা দিয়েছিল এবং সেই নিয়ে বুদ্ধদেব বসুর যে মৃদু অভিযোগ তাঁর দিকে ছুটে গিয়েছিল সে বিষয়টি আজ বাংলা কবিতার পাঠকের কাছে অল্প-বিস্তর পরিচিত বুদ্ধদেব বসুর অভিযোগটিকে উড়িয়ে না-দিয়েও এ বিষয়ে দ্বিতীয় ভাবনার অবকাশ রয়ে যায় ‘সাতটি তারার তিমির’ যে সময়ের ফসল সে সময়ের আশেপাশে বাংলার সমাজ জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তণ ঘটে গিয়েছিল। গ্রাম জীবনের থেকে নগরজীবনের দিকে বাধ্যতামূলক উত্তরণ (বা অবতরণ) এবং ব্যক্তি মানুষের যাপনের পরিসরকে দখল করে নেওয়া ‘ভয়’ (fear) – সেই পরিবর্তণের সব থেকে বড় প্রলক্ষণ সোমেন পালিতের (‘জুহু’) জগত এর আগে বাংলা কবিতায় সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিল সোমেন পালিতের জগতের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল বাজেট-মিটিংনারীপার্টি-পলিটিক্সমাংস ও মার্মালেড বস্তুতান্ত্রিক জগতের এই সু-বিপুল ভার তার আগে আর অন্য কোনও সত্তাকে এমন নিদারুণ ভাবে বহন করতে হয়নি তার চেতনার মধ্যেও ঢুকে পড়েছিল সংকট এবং এই সংকট অনিবার্যভাবে ধ্বংস করে দিয়েছিল তাঁর ‘স্বাভাবিক’ যৌন চেতনাকেও ‘ইন্সটিংক্ট’ বলে পরিচিত আবহমান ব্যক্তিগত পরিসরতার পরিনতি হয়ে পড়ছে ‘পররতিময় আত্মক্রীড়া

 

 

নারী - পুরুষ – কৃষি – যৌনতা – বস্তুতান্ত্রিক পৃথিবীর দ্বন্দ্ব – ব্যক্তিমানুষের সংকট … এই ষড়ভুজ ফ্রেম জীবনানন্দকে এই পর্যায়ে ঘিরে রেখেছিল অনেকাংশে তাঁর কৌমচেতনাকে বারবার ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল সময়,

আমাদের ক্ষেতে ভূঁয়ে অবিরাম হতমান সোনা

লে আছে বলে মনে হয়;

আমাদের হৃদয়ের সাথে

সে-সব ধানের আন্তরিক পরিচয়

নেইতবু এইসব ফসলের দেশে

সূর্য নিরন্তর হিরণ্ময়;

আমাদের শস্য তবু অবিকল পরের জিনিস

মিডলম্যানদের কাছে পর নয়‘      (সোনালি সিংহের গল্প)

-এই হাজারো ছিন্নভিন্ন টুকরোকে চেতনার মধ্যে লালন করতে করতে তিনি কি থিতু হতে চাইছিলেন এক সুস্থির জগতের মধ্যেযারা শুধু জীবনানন্দের পরাবাস্তব ও আলো-আঁধারির জগতটিকে দেখলেন তারাও অনেকটাই দেখলেন, পুরোটা দেখলেন না মানুষের মানব হয়ে ওঠার যে পথসে দিকে তাকিয়ে যে দুটি বিখ্যাত কবিতা ‘সময়ের কাছে’  ‘লোকসামান্য’, সে দুটি কবিতা শেষ হচ্ছে যথাক্রমে এভাবে,

‘… ‘আছে আছে আছে’ এই বোধির ভিতর

চলেছে নক্ষত্ররাত্রিসিন্ধুরীতিমানুষের বিষয় হৃদয়;-

জয় অস্তসূর্যজয়অলখ অরুণোদয়জয়!’

নেই এই অনুভব জয় করে আনন্দে ছড়ায়ে যেতে চায়

-এ জগত ও উচ্চারণ রবীন্দ্র-জগতের বেশ কিছুটা কাছের, প্রায় উপনিষদের রবীন্দ্রনাথের মননে ঘনিয়ে ওঠা সভ্যতার সংকট অনেক বেশি দর্শনগত সংকটের দিকে ঝুঁকে জীবনানন্দ সেখানে কিছুটা পৃথক বটে তিনি বস্তুগত সংকটের নানান স্তর পার হয়ে দর্শনগত সংকটের ক্ষেত্রটিকে ছুঁতে চেয়েছেন

    হাইড্র্যান্ট খুলে জল চেটে নেওয়া কুষ্ঠরোগীতিনজন আধো-আইবুড়ো ভিখিরী … এই সব এক একটি ধাপ সবই মানুষের হাতে ঘনিয়ে ওঠা মর-পৃথিবীর অংশ খণ্ডিত আংশিকতামসও কিছুটা 

    আর বাইরে যে রহস্যযে উন্মেষ ও উত্তরণ – সেখানে পৌঁছাতে চেয়ে অনেক অস্পষ্ট হয়ে আসছে তাঁর বিরোধাভাস স্পষ্ট হয়ে উঠছে বোধিপ্রাপ্ত জগতের ছবি ‘সাতটি তারার তিমির’-এর পাঠ ও পরাপাঠ সে-দিকেই নিয়ে যায় আমাদের, অনিবার্যভাবেপ্রতিবার


ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত

২টি মন্তব্য:

  একটি   লড়াকু   পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল, চিরঞ্...