গদ্যঃ অন্তরা দাঁ

 


'বলিনি কখনো?'

 

যে কোন পত্রিকা হাতে এলে এখনো কবিতা বিভাগটি তড়িঘড়ি খুলে দেখি, তা সে যত কাজই থাক না কেন! আলগা চোখ বুলোই, যেটির ওপর থমকাই উড পেনসিল দিয়ে দাগিয়ে রাখি, এ আমার বহুদিনের অভ্যেস। কতরকম কাগজপত্র হাতে আসে, তাতে অনেক জানা মানুষের অজানা কবিতা, ছড়া এসব আবিষ্কার করে বেশ পুলক লাগে। আসলে আমাদের জানার ঘরটি এতই সঙ্কীর্ণতার গাঢ় কালিতে ডুবে থাকে যে একটি অচেনা, অজানা জানলা মায় ঘুলঘুলি দিয়ে এক চিলতে রোদ্দুর এলেও অকস্মাৎ ঝলমলিয়ে ওঠে, তা সে যত তাৎক্ষনিকই হোক না কেন! 

 

তখন ওই ন' দশ বছর বয়েস। নবস্থা দু'নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের অঞ্চল যুব উৎসবে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় প্রথম, কিন্তু বিভাগটি যেহেতু সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত, তার প্রথম পুরষ্কারের বইটি ছিল 'বাবরের প্রার্থনা', শঙ্খ ঘোষ।

উৎসুক চপল সে বয়েসে কী যে বুঝেছি আর কী বা বুঝিনি, তা আর আজ মনে পড়ে না, শুধু মনে আছে —

'বলিনি কখনো?

আমি তো ভেবেছি বলা হয়ে গেছে কবে! '

আধুনিক কবিতা পড়তে গিয়ে এত সুন্দর অক্ষরবৃত্তে আটকে গেছি যা জীবনানন্দ পরবর্তী কবিদের মধ্যে বেশ স্বতন্ত্র মাত্রার। মানে ভঙ্গিমাটির মৌলিকত্ব নিয়ে নিয়ে কোনো প্রশ্নচিহ্ন নেই।

'শূন্যের ভিতরে ঢেউ' বেশ নাড়া দিল সেই কুসুমিত বালিকা বয়েসে। তার কিছুবছর পরে হাতে এলো শঙ্খ ঘোষের শ্রেষ্ঠ কবিতা। 'যমুনাবতী', 'বর্ম', 'সন্ততি', 'বাবুমশাই ', 'তিমির বিষয়ে দু'টুকরো ' বিখ্যাত কবিতা সব তখন গজগজ করছে মাথার ভেতর। আমার শিরদাঁড়া কতখানি ঋজু হয়েছে এই সন্নিবেশে তা জানিনা তবে একটি মাইলস্টোনের মত তিনি যে মহীরুহ হয়ে আছেন বাংলা আধুনিক কবিতার সুবিস্তীর্ণ প্রান্তরে তা নিঃসন্দেহে অন্তরে শ্রদ্ধা জাগায় বইকি!

 

'আমি উড়ে বেড়াই, আমি ঘুরে বেড়াই ' কবিতা পড়তে পড়তে আমিও অমনি। ঘুরতে-ফিরতে ছুঁয়ে দেখেছি, হাতে হাতে ঠেকছে শঙ্খবাবুর কবিতা। কলেজে পড়তে 'সঙ্গিনী' নিয়ে উন্মাদনা ছিলো খুব।

'হাতের ওপর হাত রাখা খুব সহজ নয় ' ঠাস ঠাস প্রেমে পড়লেই আওড়াচ্ছি সে'সব, আর তারপর তো ছলছল করছে রক্তে 'পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ হঠাৎ '।

প্রগাঢ় যৌবনের সেইসব তুমুল দিনে, পক্ককেশ এক প্রৌঢ় মানুষ আমাদের আশ্রয় ছিলেন, তাঁর নাম শঙ্খ ঘোষ। এখন শিথিল হয়ে আসছে গলার চামড়া, চোখে কম দেখতে আরম্ভ করেছি বেশ কিছুদিন। একুশ তারিখ এ মাসের সকাল এগারোটা নাগাদ সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন শিরোনামে 'বেদনার সাদা ফুলে আকাশ নিবিড় হবে/ অবকাশে ভরে যাবে প্রাণ ' কোভিড পজিটিভ, চলে গেলেন? আরও কিছুদিন থেকে গেলে হতো প্রতিটি দুঃখরাতে...

 

'শূন্যতাই জানো শুধু? শূন্যের ভিতরে এত ঢেউ আছে সেকথা জানো না' র মতো তৈরি হতো আরও কত শত অবিস্মরণীয় লাইন। থেকে গেলে হতো না, আরও কিছুদিন? পৃথিবীর গভীর অসুখ এখন, এই ক্রান্তিলগ্নে কার কাছে নিরাময় খুঁজবো আমরা?

 —'এই রে ঝিমোচ্ছেন নাকি '!

কম্পাউন্ডার ছেলেটির ডাকে সচকিত হই

—'এ্যাঁ, না তো!

—যত্তসব জোটেও কপালে, সক্কাল সক্কাল!  কো-মরবিডিটি আছে? জ্বর জ্বর লাগছে নাকি?

ভোর থেকে লাইন দিয়েছে শালা, আমাদের নাওয়াখাওয়া নেই! একটু নিচু গলায় বলল হিসহিসিয়ে।

মর্নিং ওয়াক সেরে, সরকারি হাসপাতালের আউটডোরে এসে বসে আছি কতক্ষণ! ভ্যাক্সিন পাওয়া যায় যদি, জিজ্ঞেস করতে এসেছি।

 

স্পষ্ট দেখলাম, গেটের কাছে শ্বেতকরবী গাছটার নীচে, একটা একটা একটা করে ফুল সাদা ধুতির কোঁচড়ে তুলে রাখছেন শঙ্খবাবু! হলুদ পাতারা খসে পড়ছে ওঁর মাথায়।

ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত

 


৩টি মন্তব্য:

  1. আপনার লেখা অত্যন্ত স্বাতন্ত্র্য হয়, এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি।
    খুবই ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  2. খুব সুন্দর একটি লেখা। পড়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

    উত্তরমুছুন
  3. খুবই ভালো লাগলো ❤️

    উত্তরমুছুন

  একটি   লড়াকু   পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল, চিরঞ্...